ফ্রান্সে বিদেশি ডেলিভারিকর্মীদের হত্যার হুমকি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

france migrant delivery workers

ফ্রান্সে বিদেশি খাবার সরবরাহকারী কর্মীদের ওপর হামলা ও হত্যার আহ্বান ছড়িয়ে পড়ায় তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ছড়িয়ে পড়া এসব বক্তব্য নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর। শ্রমিক সংগঠন ও কর্মীদের সহায়তাকারীরা বলছেন, শুধু সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডেলিভারি কোম্পানিগুলোকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

ইনফোমাইগ্রেন্টসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উগ্র ডানপন্থিদের একটি অনলাইন আলোচনায় বিদেশি ও ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে লক্ষ্য করে সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়। বিশেষভাবে নিশানা করা হয় অ্যাপভিত্তিক খাবার সরবরাহকারী কর্মীদের।

এই খাতে কর্মরত অনেকের অভিবাসনগত অবস্থান অনিয়মিত এবং আয় অনিশ্চিত। ফলে নিরাপত্তার আশঙ্কায় কাজ বন্ধ রাখা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়া অর্ডার প্রত্যাখ্যান করা—দুই ক্ষেত্রেই জীবিকা হারানোর ভয় রয়েছে তাঁদের।

বর্ণবাদী উসকানি নিয়ে তদন্ত

এক্সের ওই আলোচনার অডিও প্রকাশ করেন ফ্রান্সের বামপন্থি দল লা ফ্রঁস আনসুমিজের সংসদ সদস্য থমা পোর্ত। গত ২৫ অক্টোবর তিনি জানান, হত্যার আহ্বান ও বর্ণবাদী বিদ্বেষে উসকানির ঘটনায় প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলির কাছে অভিযোগ জানাচ্ছেন।

তদন্তে জাতিগত পরিচয় বা ধর্মের ভিত্তিতে প্রকাশ্যে বিদ্বেষ ও সহিংসতায় উসকানি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সরাসরি উসকানির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে অনলাইনের হুমকির সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট হামলার যোগসূত্র প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ডেলিভেরুও জানিয়েছে, এসব বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কোনো ঘটনার অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি।

প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে জবাব চাইবে সরকার

গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ফরাসি জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন শ্রমমন্ত্রী জঁ-পিয়ের ফারান্দু। তিনি ঘটনার গুরুত্ব স্বীকার করে দায়ীদের শনাক্ত ও শাস্তির আওতায় আনার আহ্বান জানান।

মন্ত্রী জানান, ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে কর্মীদের সুরক্ষায় তারা কী ব্যবস্থা নেবে, তা জানতে চাওয়া হবে। তাঁর বক্তব্য, জাতীয়তা, গায়ের রং, ধর্ম কিংবা জন্মপরিচয়ের কারণে কোনো কর্মীর হুমকির মধ্যে কাজ করা উচিত নয়।

উবার এসব বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে চালক ও ডেলিভারিকর্মীদের সতর্কতামূলক বার্তা পাঠানোর কথা জানিয়েছে। ডেলিভেরুও বিদ্বেষ ও সহিংসতার আহ্বান নিন্দা করেছে।

ডেলিভেরুর ভাষ্য, কর্মীরা অর্ডার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। হামলা বা বৈষম্যের শিকার হলে কোনো বিরূপ পরিণতি ছাড়াই ডেলিভারি বন্ধ করতে পারবেন। ফোন ও চ্যাটের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ এবং প্রয়োজনে বিশেষায়িত সহায়তা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

নিরাপত্তার সঙ্গে আয়ের নিশ্চয়তাও চান কর্মীরা

কোম্পানিগুলোর এসব আশ্বাস যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন প্যারিসের ডেলিভারিকর্মীদের সহায়তাকেন্দ্র ‘মেজো দে কুরসিয়ে’র সহসমন্বয়ক সির্সে লিয়েনার। তাঁর প্রশ্ন, ঝুঁকিপূর্ণ অর্ডার প্রত্যাখ্যান করলে কর্মীর আয় কমবে; পরবর্তী কাজ পাওয়া বা অ্যাকাউন্ট সচল থাকার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না—সেই নিশ্চয়তা কীভাবে দেওয়া হবে?

শ্রমিক সংগঠন সিজিটি ট্রান্সপোর্টের প্রতিনিধি লুদোভিক রিউও সরকারের বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, নিরাপত্তার জন্য কাজ বন্ধ রাখলে কর্মীর আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। তাই সুরক্ষার দায় শুধু কর্মীদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।

প্যারিসের মেয়র কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বারবারা গোমেস সন্দেহজনক অর্ডার যাচাই, নিরাপত্তার কারণে ডেলিভারি বাতিলে জরিমানা না করা এবং উপযুক্ত সহায়তাব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগ জানাতেও ভয়

অনিয়মিত অভিবাসন অবস্থায় থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রে পুলিশের কাছে যাওয়ার ভয়ও কাজ করে বলে জানিয়েছেন তাঁদের প্রতিনিধিরা। তাঁদের আশঙ্কা, অভিযোগ জানাতে গিয়ে ফ্রান্স ত্যাগের বাধ্যবাধকতামূলক আদেশ বা ‘ওকিউটিএফ’ পেতে পারেন।

এ কারণে হামলার অভিযোগ জানানো কর্মীদের সুরক্ষায় প্রশাসনিক নির্দেশনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বারবারা গোমেস। এটি তাঁর উত্থাপিত দাবি; এমন সুরক্ষা ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়নি।

তিনি ডেলিভারিকর্মীদের বেতনভুক্ত কর্মীর মর্যাদা দেওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, এতে শ্রমিক সংগঠনের সহায়তা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সরে দাঁড়ানোর অধিকার আরও সুস্পষ্ট হবে।

নিজেদের উদ্যোগে সহায়তার ব্যবস্থা

সরকার ও কোম্পানিগুলোর কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় কর্মীরা পারস্পরিক সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তুলছেন। শ্রমিক সংগঠন এফও আইএনভি টেলিগ্রামে একটি সতর্কতামূলক গ্রুপ চালু করেছে। সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে কর্মীরা সেখানে জানাতে পারবেন, যাতে অন্যরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বা পাশে যেতে পারেন।

প্যারিসের ‘মেজো দে কুরসিয়ে’ কর্মীদের একা হয়ে না পড়তে এবং সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে সহায়তা চাইতে বলেছে। সংগঠনটির সঙ্গে সমন্বয় করে সতর্কতামূলক প্রচারপত্রও প্রকাশ করা হয়েছে। এতে সন্দেহজনক অর্ডারের স্ক্রিনশট সংরক্ষণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য রেখে দেওয়ার পরামর্শ রয়েছে, যাতে অভিযোগের তদন্তে সেগুলো কাজে লাগানো যায়।