ইউরোপে প্রবেশ, অবস্থান ও এক দেশ থেকে অন্য দেশে কাজের নিয়ম

europe work visa eu migration

ইউরোপে কাজের সুযোগের জন্য বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। তবে বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন ও আশ্রয় নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে European Commission ঘোষিত Migration & Asylum Pact, EU Home Affairs ব্রিফিং এবং Eurodac ডাটাবেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইউরোপে প্রবেশ, অবস্থান ও এক দেশ থেকে অন্য দেশে কাজের নিয়ম আরও কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত হয়েছে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইউরোপের এক দেশে অবস্থান করে অন্য দেশে লিগ্যালভাবে কাজ করতে হলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া, বৈধ রেসিডেন্স স্ট্যাটাস এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট বাধ্যতামূলক।

এই প্রতিবেদনে ইউরোপে এক দেশ থেকে অন্য দেশে বৈধভাবে কাজের সুযোগ, নতুন আইন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

ইউরোপীয় মাইগ্রেশন ও অ্যাসাইলাম প্যাক্ট: কী পরিবর্তন এসেছে

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন Migration & Asylum Pact মূলত পুরো ইউরোপে অভিবাসন ব্যবস্থাকে একক কাঠামোর আওতায় আনার জন্য তৈরি করা হয়েছে। European Commission জানিয়েছে, এই নীতির মাধ্যমে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার, দ্রুত আশ্রয় প্রক্রিয়া এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন নিশ্চিত করা হচ্ছে।

নতুন ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো:

  • ইউরোপের বাহ্যিক সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা ও স্ক্রিনিং ব্যবস্থা
  • অভিবাসীদের দ্রুত শনাক্তকরণ ও নিবন্ধন
  • সব সদস্য দেশে একক আশ্রয় প্রক্রিয়া
  • সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ও সহায়তা ভাগাভাগি
  • অবৈধ চলাচল বা “secondary movement” প্রতিরোধ

ইইউ জানিয়েছে, এই আইন ২০২৪ সালে কার্যকর হয়েছে এবং পূর্ণ বাস্তবায়ন শুরু হবে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে। এর ফলে ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে অবাধভাবে গিয়ে কাজ করা আগের তুলনায় কঠিন হয়েছে।

Eurodac সিস্টেম: ইউরোপে প্রবেশের পর নজরদারি

ইইউর নতুন নীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো Eurodac ডাটাবেজ। এই সিস্টেমে ইউরোপে প্রবেশকারী প্রত্যেক আশ্রয়প্রার্থী বা অনিয়মিত অভিবাসীর বায়োমেট্রিক তথ্য (ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ) সংরক্ষণ করা হয়। এর মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় কে কোন দেশে প্রথম প্রবেশ করেছে।

এর ফলে:

  • প্রথম যে দেশে প্রবেশ করবেন, সাধারণত সেই দেশই আপনার কেস বা স্ট্যাটাস নির্ধারণ করবে
  • অন্য দেশে গিয়ে কাজ করতে চাইলে নতুন অনুমতি প্রয়োজন হবে
  • অনুমতি ছাড়া অন্য দেশে গেলে ফেরত পাঠানো হতে পারে

ইইউর ভাষায়, এই ব্যবস্থা অভিবাসীদের পরিচয় স্পষ্ট করা এবং অবৈধ চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য চালু করা হয়েছে।

ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে লিগ্যালভাবে কাজের বাস্তব নিয়ম

ইইউ আইনের অধীনে কেউ যদি একটি দেশে বৈধভাবে বসবাস করেন, তাহলেও অন্য দেশে কাজ করতে চাইলে নতুন করে আইনি অনুমোদন প্রয়োজন হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈধভাবে অন্য দেশে কাজের প্রধান পথগুলো হলো:

  • নতুন দেশের ওয়ার্ক পারমিট বা চাকরির অনুমতি
  • EU Blue Card বা স্কিলড ওয়ার্কার প্রোগ্রাম
  • কোম্পানি ট্রান্সফার ভিসা
  • স্টুডেন্ট থেকে ওয়ার্ক স্ট্যাটাস পরিবর্তন
  • লং-টার্ম রেসিডেন্ট স্ট্যাটাস (নির্দিষ্ট সময় পর)

ইইউ নীতিতে বলা হয়েছে, আশ্রয়প্রার্থী বা অনিয়মিত অভিবাসীরা ইচ্ছামতো দেশ পরিবর্তন করতে পারবেন না এবং প্রথম প্রবেশ করা দেশেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

ইউরোপে এক দেশ থেকে অন্য দেশে কাজ করতে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট

ইউরোপে বৈধভাবে অন্য দেশে কাজ করতে সাধারণত নিচের কাগজপত্র প্রয়োজন হয়:

  • বৈধ পাসপোর্ট
  • বর্তমান দেশের রেসিডেন্স পারমিট বা ভিসা
  • নতুন দেশের ওয়ার্ক পারমিট
  • চাকরির অফার লেটার বা এমপ্লয়মেন্ট কন্ট্রাক্ট
  • ট্যাক্স ও সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর
  • ঠিকানার প্রমাণ (Accommodation proof)
  • স্বাস্থ্য বীমা
  • পুলিশ ক্লিয়ারেন্স (কিছু ক্ষেত্রে)
  • বায়োমেট্রিক তথ্য নিবন্ধন

প্রতিটি দেশের নিয়ম আলাদা হলেও এসব মৌলিক ডকুমেন্ট প্রায় সবক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয়।

EU Home Affairs ব্রিফিং: সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত

EU Home Affairs সংক্রান্ত ব্রিফিং অনুযায়ী, নতুন নীতিতে সীমান্তে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিচয় যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং আশ্রয় আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এর লক্ষ্য হলো:

  • অবৈধ অভিবাসন কমানো
  • দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রদান
  • মানব পাচার প্রতিরোধ
  • আইনি অভিবাসন পথ উন্নত করা

ইইউ বলছে, নতুন ব্যবস্থা কঠোর হলেও মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

নতুন আইন কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটের পর ইউরোপ অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় সংস্কার আনতে বাধ্য হয়। নতুন Migration Pact সেই প্রেক্ষাপটেই তৈরি হয়েছে।

এই আইনের ফলে:

  • ইউরোপে অবাধ চলাচল সীমিত হয়েছে
  • কাজের জন্য লিগ্যাল স্ট্যাটাস বাধ্যতামূলক
  • ডকুমেন্ট ছাড়া দেশ পরিবর্তন কঠিন
  • অবৈধভাবে অন্য দেশে গেলে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি

বর্তমানে ইউরোপের এক দেশ থেকে অন্য দেশে কাজ করা সম্ভব হলেও তা সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করতে হয়। নতুন EU Migration & Asylum Pact, Eurodac ডাটাবেজ এবং কঠোর সীমান্ত ব্যবস্থার কারণে বৈধ ডকুমেন্ট ছাড়া দেশ পরিবর্তন বা কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপে কাজের জন্য আগ্রহীদের উচিত বৈধ চাকরির অফার, সঠিক ভিসা ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট নিশ্চিত করে আইনি পথে অগ্রসর হওয়া।