বাংলাদেশ সরকার ভারতের শিল্পগোষ্ঠী Adani Group–এর সঙ্গে করা বহুল আলোচিত বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনা শুরু করেছে। চুক্তির বিভিন্ন অসংগতি, শর্ত ও আর্থিক প্রভাব বিশ্লেষণে সচিবালয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত দেড় ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকে সরকারের চার মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, আন্তর্জাতিক চুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং কারিগরি বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আদানির সঙ্গে করা বিদ্যুৎ চুক্তিসহ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সম্পাদিত অসম চুক্তিগুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
২০১০ সালের বিশেষ আইনের আওতায় স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় রিভিউ কমিটি আদানি পাওয়ার লিমিটেডের সঙ্গে করা চুক্তিকে বিশ্বের নিকৃষ্টতম ও বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী হিসেবে উল্লেখ করে শর্ত পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের সুপারিশ করেছে।
বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, জাতীয় কমিটির সুপারিশ নিয়েই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, আগের সরকারের করা চুক্তিগুলো নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং এ বিষয়ে আরও আলোচনা হবে। জাতীয় কমিটির সদস্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান জানান, সরকার সুপারিশগুলো নিয়ে ইতিবাচকভাবে চিন্তা করছে।
শপথ গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করে রমজান, সেচ ও গরমের মৌসুম সামনে রেখে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলেন।
উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ছাড়াও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি পর্যালোচনা কমিটির সদস্যরা অংশ নেন।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে আদানির সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়।
২০১৭ সালের নভেম্বরে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০২৩ সালের এপ্রিলে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন শুরু করে।
প্রাথমিকভাবে কম দামে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে আদানির বিদ্যুতের দাম অন্যান্য উৎসের তুলনায় অনেক বেশি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। বিপিডিবির তথ্যমতে, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা, যেখানে অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুতের দাম ছিল ৮ থেকে ১০ টাকার মধ্যে।
চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ না কিনলেও বাংলাদেশকে প্রতি মাসে ৪৫০ কোটির বেশি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। গত দুই অর্থবছরে বিদ্যুৎ আমদানি বাবদ আদানিকে ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।
জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে অস্বাভাবিক সূচক ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৫০ কোটি ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করছে, যা ২৫ বছরে প্রায় এক হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
সরকার জানিয়েছে, দেশের স্বার্থ, জনস্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক আইন বিবেচনায় রেখে আদানি চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশের স্বার্থই সরকারের প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
