অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী ভিসাধারীদের ঘিরে অভিবাসন নীতিতে নতুন করে বড় ধরনের কড়াকড়ি আনছে দেশটির সরকার। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানকে সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ সীমিত করা, ভিসা বদলে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান দীর্ঘায়িত করার পথ সংকুচিত করা এবং অভিবাসন আইন মানাতে নজরদারি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নতুন এসব পরিবর্তন অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন অভিবাসন সংস্কারের বিস্তারিত তুলে ধরেন। সরকারের লক্ষ্য নেট ওভারসিজ মাইগ্রেশন বা নিট বিদেশি অভিবাসন চলতি অর্থবছরে ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনা।
তবে নতুন নিয়ম মানেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার স্টুডেন্ট ভিসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এমন নয়। বরং আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রকৃত শিক্ষার্থী হওয়ার প্রমাণ, আর্থিক সক্ষমতা, ভিসার শর্ত এবং পরিবারের সদস্য নেওয়ার নিয়ম আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিবার নেওয়ার সুযোগে বড় পরিবর্তন
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে আলোচিত দিক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের ভিসা।
টনি বার্ক জানিয়েছেন, সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও গ্র্যাজুয়েট ভিসাধারীদের সঙ্গে নতুন করে পরিবারের সদস্য যুক্ত করার সুযোগ আর আগের মতো থাকবে না। তবে ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা এবং ভিসায় পরিবার যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করা হবে না।
কিছু ব্যতিক্রমও থাকবে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নির্দিষ্ট দেশ, আসিয়ানভুক্ত দেশের নাগরিক এবং পিএইচডির মতো কিছু কোর্সের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বাংলাদেশ আসিয়ানের সদস্য নয়। ফলে ঘোষিত ব্যতিক্রমের আওতায় বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পড়ে না। তবে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন কোর্স ও কোন ধরনের আবেদনকারী ছাড় পাবেন, সেটি সংশ্লিষ্ট ভিসার কার্যকর নিয়ম দেখে নিশ্চিত হতে হবে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়তে পারে
বাংলাদেশ থেকে যাঁরা একা অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে চান, তাঁদের জন্য স্টুডেন্ট ভিসার পথ বন্ধ করা হয়নি। Subclass 500 Student visa এখনো চালু রয়েছে। এই ভিসায় কোর্স চলাকালে সাধারণ শিক্ষার্থী প্রতি দুই সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন; গবেষণাভিত্তিক মাস্টার্স ও ডক্টরাল শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।
কিন্তু স্ত্রী বা স্বামী এবং সন্তানসহ যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে—এমন বাংলাদেশি আবেদনকারীদের নতুন পারিবারিক বিধিনিষেধ বিশেষভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
একই সঙ্গে আগে থেকেই স্টুডেন্ট ভিসায় আর্থিক সক্ষমতা ও Genuine Student বা GS requirement গুরুত্বপূর্ণ। GS মূল্যায়নে আবেদনকারীকে কেন নির্দিষ্ট কোর্স ও প্রতিষ্ঠান বেছে নিয়েছেন, বর্তমান পারিবারিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কী এবং কোর্সটি তাঁর ভবিষ্যতে কীভাবে কাজে আসবে—এসব ব্যাখ্যা করতে হয়।
আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ
স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে ভ্রমণ, কোর্স ফি এবং জীবনযাত্রার খরচ বহনের পর্যাপ্ত অর্থ থাকার প্রমাণ দিতে হয়। পরিবারের সদস্য সঙ্গে থাকলে তাঁদের খরচ এবং স্কুলগামী সন্তান থাকলে শিক্ষার ব্যয়ও হিসাবের মধ্যে পড়ে।
বিকল্পভাবে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বাবা-মা বা সঙ্গীর বার্ষিক আয়ের প্রমাণ দেওয়া যায়। বর্তমানে একক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এই আয়ের মানদণ্ড অন্তত ৮৭ হাজার ৮৫৬ অস্ট্রেলীয় ডলার এবং পরিবারের সদস্য সঙ্গে থাকলে অন্তত ১ লাখ ২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলার।
এ ছাড়া ১ জুলাই ২০২৬ থেকে Student visa application charge বাড়ানো হয়েছে। কিছু দেশের নাগরিক ও নির্দিষ্ট শিক্ষাখাতে কম ফি প্রযোজ্য হলেও বাংলাদেশি আবেদনকারীর ক্ষেত্রে আবেদন করার সময় অস্ট্রেলিয়ার সরকারি Visa Pricing Estimator দেখে প্রযোজ্য ফি যাচাই করা প্রয়োজন।
‘ভিসা হপিং’ ঠেকাতেও কড়াকড়ি
অস্ট্রেলিয়া সরকার বলছে, নতুন অভিবাসন নীতির একটি লক্ষ্য হলো ‘visa hopping’ কমানো—অর্থাৎ একটি অস্থায়ী ভিসা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ঢুকে পরপর অন্য অস্থায়ী ভিসায় গিয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করার প্রবণতা সীমিত করা।
সরকার সব Visitor visa-তে ‘No Further Stay’ শর্ত প্রয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এর উদ্দেশ্য ভিজিটর ভিসাকে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে অবস্থান বাড়ানোর বিকল্প পথে পরিণত হওয়া ঠেকানো। একই সঙ্গে স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রেও ব্যবস্থার ‘integrity’ বা যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
অভিবাসন আইন কার্যকর করতে আরও ১০০ জন compliance officer নিয়োগসহ নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
কেন অভিবাসন কমাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া
কোভিড-পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন দ্রুত বেড়েছিল। সরকারি হিসাবে ২০২৩ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় Net Overseas Migration ৪৫ শতাংশের বেশি কমে ৩ লাখ ১ হাজারে এসেছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কারণে হওয়া নিট অভিবাসনও এক বছরে ১০ শতাংশ কমেছে এবং তা প্রাক-কোভিড পর্যায়ে ফিরে এসেছে বলে জুনে জানিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া সরকার।
সরকার বলছে, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, কৃষিসহ প্রয়োজনীয় খাতে দক্ষ কর্মী নেওয়া অব্যাহত রেখেই সামগ্রিক অভিবাসনকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে আনার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। রয়টার্সের হিসাবে এর বার্ষিক মূল্য প্রায় ৫৩.৬ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার। শিক্ষা খাতের প্রতিনিধিদের একটি অংশ সতর্ক করেছে, অতিরিক্ত কড়াকড়ি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে অস্ট্রেলিয়ার আকর্ষণ কমিয়ে দিতে পারে।
এখন কী করবেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা
যাঁরা বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন ঘোষণা শুনেই বর্তমান ভিসার শর্ত পরিবর্তিত হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ইতিমধ্যে পরিবারের সদস্যসহ অস্ট্রেলিয়ায় থাকা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে নতুন ব্যবস্থার কারণে আলাদা করা হবে না।
আর বাংলাদেশ থেকে নতুন করে আবেদন করতে আগ্রহীদের বিশ্ববিদ্যালয় বা এজেন্টের তথ্যের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার Department of Home Affairs-এর কার্যকর নিয়ম যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে পরিবারের সদস্য নেওয়া, আর্থিক সক্ষমতা, ইংরেজি ভাষার প্রমাণ, Genuine Student requirement এবং ভিসা ফি আবেদন জমা দেওয়ার দিন পর্যন্ত পরিবর্তিত হতে পারে।
