ম্যাচ শুরুর তখনো প্রায় দেড় ঘণ্টা বাকি। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের আকাশে চক্কর কাটছিল একটি হেলিকপ্টার। গ্যালারিতে বসে থাকা দর্শকদের চোখে তখন কৌতূহল আর বিস্ময়। ধীরে ধীরে মাঠে নামতেই লাল মখমল কাপড়ে মোড়ানো বিপিএলের ট্রফি নিয়ে হেলিকপ্টার থেকে নেমে আসেন আকবর আলী ও সালমা খাতুন। বাংলাদেশের হয়ে মহাদেশীয় ও বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে অধিনায়ক হিসেবে সাফল্য পাওয়া এই দুই ক্রিকেটারের হাত ধরেই প্রথমবারের মতো সামনে আসে এবারের বিপিএল ট্রফি।
আর রাতে সেই ট্রফিই ঘরে তোলে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। বিপিএল ফাইনালে চট্টগ্রাম রয়্যালসকে ৬৩ রানে হারিয়ে শিরোপা জয়ের উৎসবে মাতে রাজশাহী। এর আগে ২০২০ সালে রাজশাহী রয়্যালস নামে বিপিএল জিতেছিল দলটি। ভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিচয়ে এবার দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জয় করল তারা।
ফাইনালের দিন সকাল থেকেই মিরপুরজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। স্টেডিয়ামের আশপাশে রাজশাহী ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথোপকথন শোনা যাচ্ছিল। শত মাইল পাড়ি দিয়ে ঢাকায় ফাইনাল দেখতে এসেছিলেন অসংখ্য দর্শক। দুপুর গড়ানোর আগেই দর্শকে পূর্ণ হয়ে যায় শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের গ্যালারি।
ম্যাচটি শেষ হতে তখনো ১৩ বল বাকি। একপেশে হয়ে যাওয়া ফাইনাল রাজশাহী বড় ব্যবধানে জিতলেও ম্যাচে উত্তেজনার ঘাটতি ছিল না। রাজশাহীর ওপেনার তানজিদ হাসান সেঞ্চুরি করে গ্যালারিতে উচ্ছ্বাসের জোয়ার তুলেন। অন্যদিকে চট্টগ্রামের পেসার শরীফুল ইসলাম দুই উইকেট নিয়ে বিপিএলের এক আসরে সর্বোচ্চ ২৬ উইকেট শিকারের রেকর্ড গড়েন।
তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরিতে ভর করে আগে ব্যাট করে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স তোলে ২০ ওভারে ৪ উইকেটে ১৭৪ রান। জবাবে ব্যাট করতে নেমে চট্টগ্রাম রয়্যালস গুটিয়ে যায় মাত্র ১১১ রানে।
ফাইনালের আগে চট্টগ্রামের পথচলা ছিল নাটকীয়। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগের দিন দলটির মালিকানা নিতে হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি)। বদলে যায় কোচিং স্টাফ, প্রথম ম্যাচে খেলতে হয় মাত্র দুই বিদেশি ক্রিকেটার নিয়ে। সেই কঠিন বাস্তবতা পেরিয়ে ফাইনালে উঠলেও শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে বিবর্ণ ক্রিকেটই খেলেছে চট্টগ্রাম।
টস জিতে ফিল্ডিংয়ে নেমেই চট্টগ্রাম পিছিয়ে পড়ে। তানজিদ হাসানের একটি সহজ ক্যাচ ফসকায় তারা। এরপর সেই তানজিদই বিপিএলে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে সর্বোচ্চ তিনটি সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েন। আগের ১২ ম্যাচে যেখানে তাঁর রান ছিল ২৫৬, একটি মাত্র ফিফটি—সেই তানজিদই ফাইনালে ৬২ বলে ৬ চার ও ৭ ছক্কায় করেন দুর্দান্ত ১০০ রান। ক্রিস গেইল ও তামিম ইকবালের পর বিপিএল ফাইনালে সেঞ্চুরি করা তৃতীয় ব্যাটসম্যান তিনি।
চট্টগ্রামের শক্তি ছিল তাদের বোলিং আক্রমণ। শুরুতে চাপ তৈরি করলেও রাজশাহীর ওপেনিং জুটি ১০.২ ওভারে ৮৩ রান যোগ করে ভিত গড়ে দেয়। এরপর সেই ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে রাজশাহীর ব্যাটসম্যানরা বড় সংগ্রহ এনে দেন। তবে ব্যতিক্রমী দিন কাটে চট্টগ্রামের অধিনায়ক মেহেদী হাসানের, যিনি চার ওভারে কোনো উইকেট না নিয়ে দেন ৪৮ রান।
১৭৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে চট্টগ্রামের প্রয়োজন ছিল ভালো শুরু। কিন্তু ইংল্যান্ডের উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান অ্যাডাম রসিংটনের চোটে ছিটকে যাওয়ার পর থেকেই ওপেনিং সমস্যা পিছু ছাড়েনি দলটির। ফাইনালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিনুরা ফার্নান্দোর এক ওভারেই তিন বলের ব্যবধানে বিদায় নেন মোহাম্মদ নাঈম ও মাহমুদুল হাসান।
এরপরও রান তাড়া করা যদি বিস্ময়কর কিছু হতো, সেটি হতে দেননি হাসান মুরাদ। চার ওভারে মাত্র ১৫ রান দিয়ে তিন উইকেট নিয়ে চট্টগ্রামের শেষ আশাটুকুও নিভিয়ে দেন তিনি। ওপেনার মির্জা তাহির বেগ ৩৬ বলে ৩৯ রান করলেও ধীরগতির ইনিংস ম্যাচের চাহিদা মেটাতে পারেনি।
পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই গোছানো দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স। স্থানীয় ক্রিকেটারদের শক্তির সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদেশি ক্রিকেটার বেছে নেওয়ায় তাদের ভারসাম্য ছিল চোখে পড়ার মতো। নানা বিতর্ক, ম্যাচ বয়কট আর সমালোচনার মাঝেও বিপিএলের শেষ হাসি হেসেছে যোগ্য দল হিসেবেই রাজশাহী ওয়ারিয়র্স।
