দরুদ শরিফ পাঠ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত, যার মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর বিশেষ রহমত ও সম্মানের অধিকারী হন। অনেকেই জানেন যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করলে সওয়াব পাওয়া যায়, কিন্তু এর ভেতরে এমন এক গভীর রহস্য রয়েছে যা উপলব্ধি করলে হৃদয়ে এক বিশেষ অনুভূতি জাগ্রত হয়। আমরা এমন এক মহান রবের বান্দা, যিনি তাঁর প্রিয় নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন এবং সেই দরুদ পাঠকারী বান্দাকেও অসীম মর্যাদা দান করেন। আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন।
আল-কুরআন-এ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে ঈমানদাররা, তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করো এবং বেশি পরিমাণে সালাম পাঠ করো।” এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, দরুদ পাঠ এমন একটি ইবাদত যা আল্লাহ নিজেই করেন এবং মুমিনদেরও তা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই দরুদ পাঠ কেবল সওয়াবের আমল নয়, বরং এটি আল্লাহর সঙ্গে বান্দার এক গভীর সম্পর্কের প্রকাশ।
আমরা অনেকেই জানি, কোনো ব্যক্তি রাসুল ﷺ-এর ওপর একবার দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ তার ওপর দশবার সালাত বা রহমত নাজিল করেন। কিন্তু এই দশবার সালাতের প্রকৃত অর্থ নিয়ে আমরা খুব কমই চিন্তা করি। ইসলামি আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বান্দার প্রতি আল্লাহর সালাতের অর্থ হলো বান্দার ওপর রহমত বর্ষণ করা, তাকে বরকত দান করা, তার মর্যাদা বৃদ্ধি করা এবং তাকে ফেরেশতাদের মাঝে সম্মানিত করা। অর্থাৎ একজন বান্দা যখন একবার দরুদ পাঠ করে, তখন আল্লাহ তাআলা অসংখ্য ফেরেশতার সামনে তার প্রশংসা করেন এবং তাকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন।
এই বিষয়টি উপলব্ধি করলে দরুদ পাঠের অনুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়। দুনিয়ার কোনো সম্মানিত ব্যক্তি বা প্রিয় মানুষ যদি আমাদের প্রশংসা করেন, তাহলে আমরা আনন্দে আপ্লুত হয়ে যাই। অথচ দরুদ পাঠ করলে এর চেয়েও মহিমান্বিত একটি ঘটনা ঘটে—স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বান্দাকে স্মরণ করেন, তার নাম সম্মানের সঙ্গে উচ্চারণ করেন এবং তার ওপর রহমত ও বরকত নাজিল করেন। দুনিয়াতে কেউ প্রশংসা করুক বা না করুক, আল্লাহ নিজেই তার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে বান্দার গুনাহ মাফ হয়, তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং আখিরাতে তার অবস্থান উন্নত হয়।
দরুদ বা সালাত শব্দের অর্থ সম্পর্কেও ইসলামি পণ্ডিতরা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আল্লামা মনযূর নু‘মানী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, দরুদ শব্দের অর্থ দোয়া করা, সম্মান করা, প্রশংসা করা, মর্যাদা প্রদান করা এবং রহমত ও বরকত দান করা। প্রসিদ্ধ মুফাসসির ও ফকীহ আল্লামা ইবনে আতিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি সালাতের অর্থ হলো বান্দার ওপর রহমত বর্ষণ করা, তাকে বরকত দান করা এবং তার উত্তম প্রশংসা প্রচার করা। আবার প্রসিদ্ধ তাবেয়ী আবুল আলিয়া (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, বান্দার প্রতি আল্লাহর দরুদ পড়ার অর্থ হলো ফেরেশতাদের কাছে বান্দার প্রশংসা করা এবং তাকে সম্মানিত করা।
দরুদ পাঠের মর্যাদা এখানেই শেষ নয়। এটি এমন একটি আমল যা আল্লাহর সুন্নাহ, ফেরেশতাদের আমল এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ হিসেবে বিবেচিত। স্বয়ং আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন, ফেরেশতারা নবীর জন্য দোয়া করেন এবং রাসুল ﷺ নিজেও দরুদ পাঠ করতেন। তাই দরুদ পাঠ করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয় এবং এটি ঈমানের ভালোবাসার প্রকাশ।
যখন একজন মুমিন এই উপলব্ধি নিয়ে দরুদ পাঠ করেন যে আল্লাহ তাকে স্মরণ করছেন, তার নাম সম্মানের সঙ্গে উচ্চারণ করছেন এবং তার ওপর রহমত বর্ষণ করছেন, তখন তার ইবাদতের স্বাদ আরও গভীর হয়ে ওঠে। এই উপলব্ধি মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করে, অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয় এবং তাকে আরও বেশি নেক আমলের প্রতি উৎসাহিত করে।
সুতরাং দরুদ শরিফ এমন একটি ইবাদত যা সহজ, সংক্ষিপ্ত এবং সীমাহীন প্রতিদানপূর্ণ। একজন বান্দা একবার দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা তার ওপর রহমত নাজিল করেন, তাকে সম্মানিত করেন এবং ফেরেশতাদের সামনে তার প্রশংসা করেন—এটি একজন মুমিনের জন্য অকল্পনীয় সম্মান। তাই আমাদের উচিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা এবং আল্লাহর রহমত, বরকত ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।
