মুসলিম আইনে পুরুষের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ হলেও বাংলাদেশের সামাজিক ও আইনি প্রেক্ষাপটে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অপরাধ ও নৈতিকতার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। তবে এবার এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালত রায় দিয়েছেন—বাংলাদেশের কোনো মুসলিম পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক নয়।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) এ সংক্রান্ত ২৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়।
মুসলিম পারিবারিক আইন সংক্রান্ত একটি রিটের নিষ্পত্তিতে হাইকোর্ট বলেন, ‘দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির বিষয়টি স্ত্রীর এখতিয়ারভুক্ত নয়; বরং তা সংশ্লিষ্ট আরবিট্রেশন কাউন্সিলের এখতিয়ারভুক্ত।’ ফলে স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ—এমন কোনো বিধান প্রচলিত আইনে নেই বলে আদালত স্পষ্ট করেন।
রায়ে উল্লেখ করা হয়, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে পুরুষকে অবশ্যই আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হবে। তবে ওই আইনে কোথাও প্রথম স্ত্রীর অনুমতি গ্রহণকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। আদালতের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে যে ধারণা প্রচলিত ছিল—স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে অবৈধ—তা আইনের সরাসরি ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আদালত আরও বলেন, ‘যেহেতু দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি প্রদানের ক্ষমতা আরবিট্রেশন কাউন্সিলের হাতে ন্যস্ত, সেহেতু স্ত্রী অনুমতি না দিলেই বিয়ে অবৈধ হয়ে যাবে—এমন ব্যাখ্যা আইন কাঠামোর বাইরে গিয়ে তৈরি হয়েছে।’ কাউন্সিল সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য, আর্থিক সক্ষমতা এবং পারিবারিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে—এটাই আইনের মূল উদ্দেশ্য বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
আইনগত প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আদালত জানান, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪৯৪ ধারায় দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও, ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর মুসলিম পুরুষদের ক্ষেত্রে সেই কঠোরতা শিথিল করা হয়। নতুন আইনে দ্বিতীয় বিয়েকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে তা আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে। অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এদিকে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছেন রিটকারীরা। তাঁদের মতে, এ সিদ্ধান্তের ফলে বহুবিবাহের ক্ষেত্রে নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে। নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমান অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই তাঁরা রিট দায়ের করেছিলেন বলে জানান।
