ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক বিমান পরিবহন খাতে। জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার ক্যান্টাস এয়ারওয়েজ, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন্স এসএএস এবং এয়ার নিউজিল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা বিমান ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের পতাকাবাহী বিমান সংস্থা এয়ার নিউজিল্যান্ড জানায়, সংঘাতের আগে জেট ফুয়েলের দাম প্রতি ব্যারেল ৮৫ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বেড়ে ১৫০ থেকে ২০০ ডলারে পৌঁছেছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে সংস্থাটি ২০২৬ সালের জন্য তাদের আর্থিক পূর্বাভাস সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে বৈশ্বিক ভ্রমণ ও পর্যটন খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের টিকিটের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি পর্যটন শিল্পে বড় ধাক্কা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন্স (এসএএস)-এর একজন মুখপাত্র বলেন, জ্বালানি খরচের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সামাল দিতে সাময়িকভাবে টিকিটের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
এসএএস আগে থেকেই জ্বালানি হেজিং নীতি পরিবর্তন করেছিল এবং বর্তমানে আগামী ১২ মাসের জন্য তাদের কোনো আগাম জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ করা নেই।
অন্যদিকে ইউরোপের বেশ কয়েকটি বড় বিমান সংস্থা যেমন লুফথানসা ও রায়ানএয়ার জ্বালানি হেজিং পদ্ধতি ব্যবহার করে আগাম নির্দিষ্ট মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করে রেখেছে।
ফিনএয়ার জানিয়েছে, তারা তাদের প্রথম প্রান্তিকের জ্বালানি চাহিদার ৮০ শতাংশ আগেভাগেই কম দামে কিনে রেখেছে। তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু দাম নয়, জ্বালানির প্রাপ্যতাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সংস্থাটির একজন মুখপাত্র বলেন, বর্তমানে কোনো জ্বালানি সংকট তৈরি হয়নি, তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক বিমান সংস্থা তাদের রুট পরিবর্তন করছে। এর ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে জনপ্রিয় রুটগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং টিকিটের দাম বেড়ে যাচ্ছে।
হংকংয়ের ক্যাথে প্যাসিফিক জানিয়েছে, তারা মার্চ মাসে লন্ডন ও জুরিখ রুটে অতিরিক্ত ফ্লাইট যুক্ত করছে।
এয়ার নিউজিল্যান্ড ইতোমধ্যে ভাড়া বৃদ্ধি করেছে। তাদের ঘোষণা অনুযায়ী—
- অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে একমুখী ভাড়া বেড়েছে ৬ ডলার
- স্বল্প দূরত্বের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ১২ ডলার
- দীর্ঘ দূরত্বের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ৫৩ ডলার
এছাড়া পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আরও ভাড়া বৃদ্ধি বা ফ্লাইট সূচিতে পরিবর্তন আনা হতে পারে।
হংকং এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, তারা তাদের জ্বালানি সারচার্জ সর্বোচ্চ ৩৫.২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াবে। বিশেষ করে হংকং থেকে মালদ্বীপ, বাংলাদেশ ও নেপালগামী ফ্লাইটে এই ভাড়া বৃদ্ধি বেশি হবে।
গত ৯ মার্চ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৯ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। পরে তা কিছুটা কমে প্রায় ৯০ ডলারে নেমে আসে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে বলে মন্তব্য করার পর কিছু বিমান সংস্থার শেয়ারের দাম বাড়তে শুরু করে।
ইউরোপের বাজারে এয়ারলাইনগুলোর শেয়ার ৪ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিমান সংস্থাগুলোর শেয়ার প্রথমদিকে ২ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমান সংস্থাগুলোর মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশই জ্বালানি খরচ। তাই তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তা সরাসরি বিমান ভাড়া এবং বৈশ্বিক ভ্রমণ শিল্পকে প্রভাবিত করে।
ইতোমধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অনেক ইউরোপীয় বিমান সংস্থা রাশিয়ার আকাশপথ এড়িয়ে দীর্ঘ রুটে চলাচল করছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
