রোজা: পরিচয়, ইতিহাস ও ইসলামে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পটভূমি

Ramadan Roja

রোজা শব্দটি মূলত ফারসি ভাষার শব্দ। ফারসিতে রোজাকে বলা হয় “روزہ”। এর আরবি প্রতিশব্দ হলো “صَوْم (সওম)” এবং এর বহুবচন হলো “صِيَام (সিয়াম)”।

ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভ রয়েছে। এই পাঁচটি স্তম্ভের ওপরই ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। এগুলো হলো—

১. কালেমা (ঈমানের সাক্ষ্য)
২. নামাজ
৩. রোজা
৪. যাকাত
৫. হজ

এর মধ্যে রোজা বা সওম হলো ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে রোজার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

ইসলামের পরিভাষায় রোজা বা সিয়াম বলতে বোঝায়—
সুবহে সাদেক অর্থাৎ ভোরের সূক্ষ আলো উদিত হওয়ার পর থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার, কামাচার বা যৌনাচার এবং রোজা ভঙ্গকারী যাবতীয় কাজ থেকে বিরত থাকার নামই রোজা।

শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করাই রোজার উদ্দেশ্য নয়। বরং রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা, ধৈর্য ও সংযম অর্জন করা এবং আল্লাহর ভয় বা তাকওয়া অর্জন করা।

ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও সক্ষম প্রতিটি মুসলমান নারী ও পুরুষের ওপর রমজান মাসের প্রতিদিন রোজা রাখা ফরজ। তবে অসুস্থ, মুসাফির, গর্ভবতী নারী বা এমন ব্যক্তি যাদের জন্য রোজা রাখা কঠিন, তাদের জন্য শরিয়তে কিছু বিধান ও ছাড় রয়েছে।

রোজার ইতিহাস

রোজা কেবল উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য নির্ধারিত কোনো নতুন ইবাদত নয়। বরং পৃথিবীর শুরু থেকেই বিভিন্ন নবী-রাসূলের যুগে রোজা পালনের প্রচলন ছিল।

এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

অর্থাৎ—

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল; যাতে করে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।”
(সূরা বাকারা: ১৮৩)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, রোজা শুধু মুসলমানদের ওপরই ফরজ করা হয়নি; বরং পূর্ববর্তী অনেক জাতির ওপরও রোজার বিধান ছিল।

হযরত আদম (আ.) এর যুগে রোজা

কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানবজাতির প্রথম নবী হযরত আদম (আ.)-এর যুগেও রোজার প্রচলন ছিল।

বর্ণিত আছে, যখন হযরত আদম (আ.) নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করেছিলেন, তখন তিনি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং তাওবা করেন। তবে তাঁর সেই তাওবা সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়নি।

কথিত আছে, দীর্ঘ ৩০ দিন পর তাঁর তাওবা কবুল হয়। এরপর তাঁর সন্তানদের ওপর ৩০ দিনের রোজা ফরজ করা হয়েছিল বলে কিছু ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়।

এই বর্ণনাটি ইসলামী ঐতিহাসিক গ্রন্থ ফাতহুল বারী (৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০২–১০৩)-এ উল্লেখ করা হয়েছে।

হযরত নূহ (আ.) এর যুগে রোজা

মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন নবী হযরত নূহ (আ.)-এর যুগেও রোজার প্রচলন ছিল।

একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

“হযরত নূহ (আ.) ১ শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ছাড়া সারা বছর রোজা রাখতেন।”

অর্থাৎ তিনি বছরের অধিকাংশ সময়ই রোজা রাখতেন এবং কেবল দুটি দিন—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখতেন না।

এই হাদিসটি ইবনে মাজাহ (হাদিস নং ১৭১৪)-এ বর্ণিত হয়েছে।

হযরত ইবরাহীম (আ.) এর যুগে রোজা

কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর যুগেও ৩০ দিনের রোজা পালনের প্রচলন ছিল।

যদিও এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ও সহিহ হাদিস কম পাওয়া যায়, তবে অনেক ঐতিহাসিক ও তাফসির গ্রন্থে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

হযরত দাউদ (আ.) এর রোজা

হযরত দাউদ (আ.)-এর রোজা ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। তাঁর রোজাকে বলা হয় সওমে দাউদি

হাদিসে উল্লেখ রয়েছে—

“আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোজা হলো দাউদ (আ.)-এর রোজা। তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং একদিন রোজা ছেড়ে দিতেন।”

অর্থাৎ তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং পরের দিন রোজা রাখতেন না।

এই হাদিসটি সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, নাসাঈ এবং মিশকাত শরীফ-এ বর্ণিত হয়েছে।

ইসলাম-পূর্ব আরবদের মধ্যে রোজা

ইসলাম আগমনের পূর্বেও আরবদের মধ্যে রোজার প্রচলন ছিল।

বিশেষ করে মক্কার কুরাইশরা আশুরার দিনে (১০ মহররম) রোজা রাখত। এর একটি কারণ ছিল—এই দিন কাবা শরিফে নতুন গিলাফ পরানো হতো।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন—

“রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে মুসলমানরা আশুরার রোজা পালন করতেন। সেই দিন কাবা শরিফে গিলাফ পরানো হতো। পরে যখন রমজানের রোজা ফরজ করা হলো, তখন রাসুল (সা.) বললেন—যে ইচ্ছা আশুরার রোজা রাখবে এবং যে ইচ্ছা তা ছেড়ে দেবে।”

এই হাদিসটি সহিহ বুখারি (হাদিস নং ১৫৯২)-এ বর্ণিত হয়েছে।

ইহুদিদের মধ্যে আশুরার রোজা

মদিনায় বসবাসকারী ইহুদীরাও আশুরার দিনে রোজা পালন করত।

তারা নিজেদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সপ্তম মাসের দশম দিনে রোজা রাখত। তাদের বিশ্বাস ছিল যে এই দিনে আল্লাহ তায়ালা হযরত মুসা (আ.) এবং তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর যখন দেখলেন ইহুদীরা আশুরার রোজা পালন করছে, তখন তিনি মুসলমানদেরও এই রোজা রাখতে উৎসাহিত করেন।

রমজানের রোজা ফরজ হওয়া

রমজানের রোজা ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

দ্বিতীয় হিজরি সনে মদিনায় মুসলমানদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়।

এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ঘোষণা করেন—

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ…

অর্থাৎ—

“রমজান মাসই সেই মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন; যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসের রোজা রাখে। আর যে অসুস্থ বা মুসাফির থাকবে, সে অন্য দিনে তা পূরণ করবে।”

(সূরা বাকারা: ১৮৫)

এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর থেকেই সমস্ত সক্ষম মুসলমানের ওপর পুরো রমজান মাস রোজা রাখা ফরজ হয়ে যায়।

রোজা ফরজ হওয়ার প্রাথমিক বিধান

ইসলামের প্রাথমিক যুগে রোজার বিধান কিছুটা সহজ ছিল।

সেই সময়—

  • কেউ চাইলে রোজা রাখতে পারত
  • আবার কেউ চাইলে রোজা না রেখে একজন দরিদ্র ব্যক্তিকে খাবার খাওয়াতে পারত

কিন্তু ধীরে ধীরে যখন মুসলমানরা রোজা পালনে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন পরবর্তী বিধানের মাধ্যমে রোজা রাখা প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও সক্ষম মুসলমান নারী-পুরুষের ওপর বাধ্যতামূলক করা হয়।

তবে শরিয়ত অসুস্থ ব্যক্তি, মুসাফির এবং অক্ষম মানুষের জন্য কাজা বা ফিদয়ার ব্যবস্থা রেখেছে।

রোজা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; বরং আত্মসংযম, ধৈর্য, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মহান মাধ্যম।

রমজান মাসে মুসলমানরা সারা দিন রোজা রেখে নিজেদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করে এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশা করে।

এই কারণেই রমজান মাসকে বলা হয় বরকত, রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস।