দীর্ঘ ২১ বছর। সময়টা শুধু ক্যালেন্ডারের হিসাব নয়—এটা ছিল অপেক্ষা, স্মৃতি আর না-বলা কথার ভার। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো। বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাতে সিলেটের মাটিতে পা রাখলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর তার সঙ্গে সঙ্গে আবেগে ভাসল পুরো নগরী।
তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন—এই শহরের জামাই, এই মাটির সঙ্গে আত্মিক বন্ধনে বাঁধা একজন আপন মানুষ। তাই তাকে এক নজর দেখার অপেক্ষায় ছিলেন শুধু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মানুষ নয়, রাজনীতির বাইরের অসংখ্য সাধারণ মানুষও।
সন্ধ্যা ৭টা ৫৬ মিনিটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে তারেক রহমান, তার সহধর্মিণী দক্ষিণ সুরমার কন্যা ডা. জুবাইদা রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে বহনকারী বিমান। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা। দীর্ঘদিন পর প্রিয় নেতাকে কাছে পেয়ে অনেকের চোখেই ছিল আনন্দাশ্রু।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে বহুল আলোচিত লাল বুলেটপ্রুফ বাসে করে তিনি রওনা হন হযরত শাহজালাল (র.)–এর মাজারের উদ্দেশে। সেখান থেকেই শুরু হয় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ হাত নেড়ে, স্লোগান দিয়ে, প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে জানাতে থাকেন ভালোবাসা আর স্বাগত। কারও চোখে বিস্ময়, কারও চোখে আনন্দ, আবার কারও চোখে দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয় মানুষকে ফিরে পাওয়ার আবেগ।
তারেক রহমানও নীরব থাকেননি। হাসিমুখে হাত নেড়ে, কখনো সালাম জানিয়ে তিনি সবার শুভেচ্ছার জবাব দিতে থাকেন। সেই মুহূর্তে যেন নেতা আর জনগণের মাঝের দূরত্ব মিলিয়ে গিয়েছিল।
অপেক্ষারত মানুষ আবেগে ভেঙে পড়ে নিরাপত্তা বেষ্টনি, নেমে আসেন গাড়ির সামনে। প্রিয় নেতাকে এত কাছ থেকে দেখার আকুলতা সামলাতে পারেননি অনেকেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে, আবার এগিয়ে যায় লাল গাড়িটি।
মাজার এলাকায় পৌঁছানোর পরও মানুষের কৌতুহল আর উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েনি। রাত সাড়ে ৮টার কিছু পরে তিনি হযরত শাহজালাল (র.)–এর মাজারে প্রবেশ করেন। নীরবে জিয়ারত করেন, বিশেষ মোনাজাতে হাত তোলেন—হয়তো নিজের জন্য, হয়তো দেশের জন্য, হয়তো দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ফিরে আসার এই মুহূর্তের জন্য।
রাত সোয়া ৯টার দিকে দরগাহ মসজিদে আদায় করেন এশার নামাজ। এরপর মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, সিলেটের গর্ব কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীর কবরে শ্রদ্ধা জানান। ইতিহাস, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের সামনে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি।
রাত প্রায় ১০টার দিকে হযরত শাহপরান (র.)–এর মাজারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হয়। জনতার ঢল এড়াতে কখনো চেনা পথ, কখনো অচেনা পথে চলতে হয়। মাত্র কয়েক মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। অবশেষে রাত ১১টার দিকে পৌঁছান শাহপরান (র.)–এর মাজারে।
