“আমার আন্তর্জাতিক আইন দরকার নেই”: ট্রাম্পের মন্তব্যে উদ্বিগ্ন ইউরোপ

trump international law eu crisis 2026

ব্রাসেলসে সপ্তাহজুড়ে ভারী তুষারপাতের মধ্যেই ছুটি শেষে কাজে ফিরেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শীর্ষ কর্মকর্তারা। কিন্তু প্রকৃত ‘ঠান্ডা ঝাঁকুনি’ এসেছে আবহাওয়া নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক আগ্রাসী পদক্ষেপে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরাতে মার্কিন উদ্যোগ, ন্যাটো নিয়ে প্রশ্ন, কিউবা ও ইরানকে হুমকি এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা—সব মিলিয়ে ইউরোপের নেতৃত্ব কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের স্পষ্ট ঘোষণা—“আমার আন্তর্জাতিক আইন দরকার নেই।” এই বক্তব্য শুধু প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মতো বৈশ্বিক চুক্তিকেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন তৈরির সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

ইইউ প্রতি বছর দুই হাজারের বেশি নির্দেশনা, আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করে ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবন পরিচালনা করে। কিন্তু এমন এক বিশ্বব্যবস্থায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আইনের শাসনের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে, সেখানে ইইউর এই আইনপ্রণয়ন ব্যবস্থা দ্রুতই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কূটনীতিকরা।

২০২৬ সালের প্রথম সপ্তাহই আবারও দেখিয়ে দিয়েছে—একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের একক সিদ্ধান্তের সামনে ইউরোপ কতটা অসহায়। ইউরোপীয় এক কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীদের হালকাভাবে নেওয়ার প্রবণতা ইউরোপীয় গণমাধ্যমে ছিল, যা ছিল ভুল। “তারা অত্যন্ত সক্ষম এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত,” বলেন তিনি।

ইউক্রেন সংকটেই ইউরোপের জট

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রায় এক বছর পার হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের দূরত্ব নিয়ে কৌশলগত কোনো বড় আলোচনা হয়নি। এর মূল কারণ ইউক্রেন যুদ্ধ। নিরাপত্তার জন্য ন্যাটোর ওপর নির্ভরশীল ইউরোপ, একই সঙ্গে ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি কার্যকরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপরও নির্ভর করছে।

এই সপ্তাহে ইউক্রেনের মিত্রদের এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হলেও, যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না এবং তাতে ট্রাম্প প্রশাসনের স্বাক্ষরও নেই। ফলে এই মুহূর্তে ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করা ইউরোপের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার মতো বড় পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনের জন্য ইউরোপের ভেতরে যে রাজনৈতিক ঐকমত্য দরকার, তা এখনো তৈরি হয়নি।

ম্যাক্রোঁর সতর্কবার্তা, কিন্তু দুর্বল অবস্থান

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে প্রভাব বলয়ে ভাগ করতে চাইছে এবং আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন থেকে সরে যাচ্ছে। তিনি ইউরোপকে ‘নতুন উপনিবেশবাদ’ মেনে না নেওয়ার আহ্বান জানান এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন জোরদারের কথা বলেন।

তবে নিজ দেশেই ম্যাক্রোঁ এখন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল। অচল সংসদ ও শক্তিশালী হয়ে ওঠা কট্টর ডানপন্থীদের কারণে ব্রাসেলসে তাঁর প্রভাব আগের মতো নেই। এমনকি সাম্প্রতিক ভাষণে তিনি ট্রাম্প বা ভেনেজুয়েলার ঘটনা সরাসরি উল্লেখও করেননি।

বিশ্ব রাজনীতিতে ইউরোপের প্রান্তিকতা

গাজা, ইরান কিংবা লাতিন আমেরিকার মতো ইস্যুতে ইউরোপ কার্যত দর্শকের ভূমিকায়। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের পর ইইউর পক্ষ থেকে একক অবস্থানও দেখা যায়নি। ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় কাউন্সিল ও ইইউর পররাষ্ট্রপ্রধান—তিন দিক থেকে তিনটি আলাদা বিবৃতি আসে। এর মধ্যেও হাঙ্গেরি একটি বিবৃতিতে সই করেনি।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, যিনি নিজে একজন আইনজীবী, ক্ষমতায় এসে ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা নিয়েও শক্ত অবস্থান নিতে পারেননি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় যা করছে, তাতে আপত্তি না জানিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নৈতিক চাপ কীভাবে বজায় রাখা সম্ভব?

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতেও ইউরোপীয় নেতাদের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত নরম। “আইন শক্তির চেয়ে বড়”—ইউরোপীয় কমিশন প্রধান উরসুলা ভন ডার লেয়েনের এই মন্তব্য কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।

এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের ভাষায়, “বিশ্ব আর ইউরোপীয় মূল্যবোধে পরিচালিত হচ্ছে না। বিশ্ব এখন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে চলছে। ইউরোপকে নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে।”