পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের মার্তিম মুনিজ এলাকা। বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আধিক্যের কারণে রুয়া দো বেনফরমোসো ও আশপাশের এলাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে পরিচিত ‘বাঙালি গলি’ নামে। এলাকাটিতে বসবাস করেন বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি।
সম্প্রতি এই এলাকায় কয়েকজন বাংলাদেশির মৃত্যুতে প্রবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ স্ট্রোকে, আবার কেউ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। দীর্ঘদিনের অভিবাসনসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, কাজের চাপ, অর্থনৈতিক সংকট ও মানসিক দুশ্চিন্তার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচেতনতার ঘাটতিও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন প্রবাসীদের কেউ কেউ।
শুক্রবার রাতে ঘুমের মধ্যে মারা যান যশোরের ২২ বছর বয়সী জিহাদ। একই বাসায় থাকা প্রবাসীদের ভাষ্য, তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
এর আগে গত ৫ আগস্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মুন্সিগঞ্জের সাইফুল ইসলাম। প্রায় ১৫ বছর অপেক্ষার পর বৈধতা পাওয়ার পর দেশে ফেরার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু দেশে ফেরার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।
কাগজপত্রের জটিলতা, কাজের সংকট
পর্তুগালে থাকা কয়েকজন বাংলাদেশি প্রবাসী জানান, সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্রের জটিলতা তাঁদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। নতুন করে দেশটিতে আসা অনেকের কাজ পেতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ফলে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে অনেকে চাপে পড়ছেন।
একজন প্রবাসী বলেন, ‘এখানে আসার পর এখন সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে ডকুমেন্টের ঝামেলা। আগে যে প্রক্রিয়াগুলো ছিল, সরকারের পক্ষ থেকে সেগুলো দিন দিন কঠিন করা হচ্ছে।’
তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে পর্তুগালে একধরনের সংকট চলছে। বিশেষ করে নতুন আসা অনেকের কাজ নেই। এর সঙ্গে দেশে থাকা পরিবারের প্রত্যাশা ও নানা ধরনের পারিবারিক চাপ যুক্ত হয়ে প্রবাসীদের অনেকের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
প্রবাসীদের কেউ কেউ মনে করেন, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, কাজের চাপ, অর্থনৈতিক সমস্যা এবং মানসিক দুশ্চিন্তার প্রভাব শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়তে পারে। তবে এসব কারণের সঙ্গে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান বা গবেষণা পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান
প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে বলছেন, কাজের ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান না অনেকেই। অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলেও কেউ কেউ চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। এতে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
হঠাৎ মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, হাত-পা দুর্বল হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, ভারসাম্য হারানো বা তীব্র মাথাব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
একজন প্রবাসী বলেন, ‘আপনার জীবন যদি থাকে, তাহলে আপনি ভালো কিছু করতে পারবেন। হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এখন পর্তুগালে সাময়িকভাবে হয়তো অনেকে হতাশায় আছেন। অচিরেই এই পরিস্থিতি দূর হয়ে ভালো সময় আসবে। কিন্তু তখন পর্যন্ত আমাদের টিকে থাকতে হবে।’
তীব্র গরমেও বাড়ছে উদ্বেগ
এদিকে পর্তুগালে সাম্প্রতিক তীব্র গরম জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যের বরাতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তাপপ্রবাহের সময় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
অতিরিক্ত গরমে বয়স্ক ব্যক্তি এবং হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভোগা ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেশি থাকে। এ কারণে প্রবাসীদের পর্যাপ্ত পানি পান, অতিরিক্ত গরম এড়িয়ে চলা এবং অসুস্থ বোধ করলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
‘হতাশ না হয়ে টিকে থাকতে হবে’
পর্তুগালে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি অংশের মতে, অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা ও কাজের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি প্রবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাঁদের ভাষ্য, প্রবাসজীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যে অনেকেই পরিবার থেকে দূরে থাকেন। কাজের অনিশ্চয়তা ও দেশে থাকা পরিবারের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় নিজেদের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া জরুরি।
সাম্প্রতিক কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনায় প্রবাসীদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা থেকে স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এসেছে। প্রবাসীদের মতে, কঠিন সময় এলেও হতাশ না হয়ে নিজেদের সুস্থতা ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
