প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিবাহ নিবন্ধন, সন্তানের জন্মনিবন্ধন, সম্পত্তি হস্তান্তর, উত্তরাধিকার ও শিক্ষাগত সনদসহ বিভিন্ন নথি সত্যায়নের ক্ষেত্রে অভিন্ন নির্বাহী নির্দেশনা জারি ও বাস্তবায়নে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস, হাইকমিশন ও কনস্যুলেটে নোটারাইজড ও অ্যাপোস্টিল করা নথি গ্রহণের ক্ষেত্রে অভিন্ন পদ্ধতি চালু করতে কেন সার্কুলার, নির্বাহী নির্দেশনা ও প্রশাসনিক গাইডলাইন জারি করা হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল দেন।
যে কারণে রিট
বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের নথি সত্যায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাংলাদেশ মিশনে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণের অভিযোগে রিটটি করা হয়।
রিটে বলা হয়েছে, কোনো কোনো বাংলাদেশ মিশন উৎসরাষ্ট্রে যথাযথভাবে অ্যাপোস্টিল করা নথি গ্রহণ করলেও অন্য কোনো মিশনে একই ধরনের নথির জন্য অতিরিক্ত সত্যায়ন, পাল্টা সত্যায়ন বা কনস্যুলার অথেন্টিকেশন চাওয়া হয়।
এতে একই নথি নিয়ে প্রবাসীদের একাধিক সরকারি দপ্তর, নোটারি, অ্যাপোস্টিল কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ মিশনে যেতে হচ্ছে। ফলে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি তাঁদের ভোগান্তিও বাড়ছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নূর ই আলম আবেদনকারী হয়ে রিটটি করেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তাঁকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান ও মো. আরশাদুর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খাঁন জিয়াউর রহমান।
অ্যাপোস্টিল নথি নিয়ে প্রশ্ন
রিটে বলা হয়েছে, হেগ অ্যাপোস্টিল কনভেনশন অনুযায়ী উৎসরাষ্ট্রে যথাযথভাবে অ্যাপোস্টিল করা পাবলিক ডকুমেন্ট অতিরিক্ত সত্যায়ন ছাড়া গ্রহণের জন্য বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের সব মিশনে অভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়নে নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কনভেনশনটির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সব দূতাবাস, হাইকমিশন ও কনস্যুলেটে অবিলম্বে অভিন্ন সার্কুলার, নির্বাহী নির্দেশনা ও প্রশাসনিক গাইডলাইন জারির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, রুলে সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে।
রিটে আইন মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের সার্কুলার এবং ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বরের এসআরও বিদেশে অবস্থিত সব বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়েও আদালতের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে।
বাড়ছে প্রবাসীদের ভোগান্তি
রিট আবেদনকারীর আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, বিদেশে থাকা বাংলাদেশি নাগরিক, শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রয়োজনে জন্মসনদ, বিবাহসনদ, শিক্ষাগত সনদ, আদালতের নথি, পাওয়ার অব অ্যাটর্নিসহ বিভিন্ন সরকারি নথি বাংলাদেশে ব্যবহার করতে হয়।
অনেক ক্ষেত্রে এসব নথি সংশ্লিষ্ট দেশে আইন অনুযায়ী নোটারাইজড ও অ্যাপোস্টিল করার পরও বাংলাদেশ মিশন থেকে আবার সত্যায়ন বা পাল্টা সত্যায়ন নিতে বলা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাসস্থান থেকে কয়েক শ কিলোমিটার দূরে। ফলে দূতাবাসে যেতে যাতায়াত ব্যয়, আবাসন খরচ, কর্মস্থল থেকে ছুটি এবং অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য অপেক্ষার মতো বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়। এর সঙ্গে মূল নথি কুরিয়ারে পাঠানোর ঝুঁকিও থাকে।
অতিরিক্ত সত্যায়নের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর্যন্ত সময় চলে যায় বলে রিট আবেদনকারীর পক্ষ থেকে আদালতকে জানানো হয়েছে।
এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময়সীমা পার হয়ে যাওয়া, চাকরিতে যোগদানে বিলম্ব এবং ভিসা বা অভিবাসনপ্রক্রিয়া আটকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া বিবাহ নিবন্ধন, সন্তানের জন্মনিবন্ধন, সম্পত্তি হস্তান্তর, উত্তরাধিকার এবং আদালতের কার্যক্রমও এতে প্রভাবিত হতে পারে বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনজীবী ইশরাত হাসানের মতে, একই নথির জন্য বারবার সত্যায়ন করাতে গিয়ে প্রবাসীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ও সময় নষ্ট হচ্ছে। এটি শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়, অনেকের জন্য আর্থিক ও মানসিক হয়রানিরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
হাইকোর্টের এই রুলের ফলে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের নথি সত্যায়নের ক্ষেত্রে অভিন্ন ও স্পষ্ট প্রক্রিয়া চালুর বিষয়টি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
