রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেওয়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাক হোসেনকে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। সেখানেই তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সরকারসংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। তবে রোববার রাত পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এক দিন আগে শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় একটি কথিত মাদকের আস্তানায় অভিযানে যান ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তাঁর নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে তাঁকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে কয়েকজন ব্যক্তিকে ধাওয়া করতে দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে থাকা অন্তত একজনের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর একজন প্রতিমন্ত্রী নিজে অস্ত্র হাতে এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনা শুরু হয়।
গাড়ি থেকে নেমেই অস্ত্র হাতে ধাওয়া
শনিবার বিকেলে গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় ওই অভিযান চালানো হয়।
ইশরাকের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি একটি গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে কয়েকজনকে ধাওয়া করছেন। তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরাও তাঁদের ধরতে ছুটে যান। একটি ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রীর হাতে থাকা অস্ত্রের অংশ অস্পষ্ট করে দেওয়া হলেও অন্য দৃশ্যে সেটি স্পষ্ট দেখা যায়।
ভিডিওতে ইশরাককে লোকজনকে থামতে নির্দেশ দিতে শোনা যায়। তাঁর সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তির কাছ থেকেও গুলি করার হুমকিসূচক বক্তব্য শোনা যায় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আটক কয়েকজনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে একজন প্রতিমন্ত্রীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো করে অস্ত্র হাতে সরাসরি অভিযানে অংশ নেওয়ার এখতিয়ার আছে কি না—সে প্রশ্ন সামনে আসে।
ঘটনার তদন্ত করছে ডিএমপি
ইশরাক হোসেন ও তাঁর সহযোগীদের অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
রোববার ডিএমপির গণমাধ্যম কেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে পুরো ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, তদন্তে আইনের কোনো ব্যত্যয় পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একজন মন্ত্রী পুলিশি দায়িত্ব পালন করতে পারেন কি না—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর অবশ্য দেননি ডিবিপ্রধান।
অস্ত্রটি লাইসেন্সকৃত, আত্মরক্ষার জন্য তুলেছিলেন—ইশরাক
সমালোচনার মুখে রোববার ঘটনার ব্যাখ্যা দেন ইশরাক হোসেন। তাঁর দাবি, অভিযানের সময় তিনি যে অস্ত্রটি হাতে নিয়েছিলেন, সেটি তাঁর লাইসেন্সকৃত অস্ত্র এবং আত্মরক্ষার জন্যই তিনি সেটি বের করেছিলেন।
ইশরাকের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদকের আস্তানার কাছাকাছি যাওয়ার পর প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন লোক তাঁদের গাড়িবহরের দিকে আক্রমণাত্মকভাবে এগিয়ে আসছিলেন। সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়েও তিনি আগে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে তিনি ও তাঁর নিরাপত্তাকর্মীরা স্বল্প সময়ের জন্য অস্ত্র বের করেন বলে দাবি করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, কাউকে ভয় দেখানো তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না এবং তিনি কোনো গুলি ছোড়েননি। মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধের অংশ হিসেবেই এ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে বলে তাঁর বক্তব্য।
লাইসেন্স থাকলেও যেভাবে অস্ত্র দেখানো নিষিদ্ধ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০২৫’-এর ২৫ অনুচ্ছেদে লাইসেন্স করা অস্ত্র বহন ও ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি নীতিমালাটি ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশ করা হয়।
নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি আত্মরক্ষার জন্য নিজের নামে লাইসেন্স করা অস্ত্র বহন বা ব্যবহার করতে পারেন। তবে এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না, যাতে অন্যের মনে ভীতি বা বিরক্তি সৃষ্টি হতে পারে। সাধারণভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে।
ইশরাকের ঘটনায় এই নীতিমালা বা অন্য কোনো আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, সেটিই এখন ডিএমপির তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সরকার ও দলের ভেতরে অস্বস্তি
অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রীর অভিযানের ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নয়, সরকার ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দেয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে সরকার ও বিএনপিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে বলা হয়েছে, মাদকবিরোধী উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজে অস্ত্র হাতে এ ধরনের অভিযানে নামাকে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি সংশ্লিষ্ট অনেকে।
এর মধ্যেই রোববার বিকেলে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর ইশরাককে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর আসে। বিষয়টিকে মন্ত্রিসভার সদস্যদের আচরণ ও জবাবদিহির প্রশ্নে সরকারের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সরকারসংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি। তবে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে কি না বা তা গ্রহণ করা হয়েছে কি না—রোববার রাত পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
