জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের প্রতিবাদে পর্তুগালের বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানী লিসবনসহ পোর্তো ও কোইমব্রা শহরে আয়োজিত বিক্ষোভে বেতন ও পেনশন বৃদ্ধি, আবাসন সংকট সমাধান এবং সরকারি সেবার মান উন্নয়নের দাবি জানানো হয়।
দেশটির অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন কনফেডারেশন অব পর্তুগিজ ওয়ার্কার্স (CGTP) এই কর্মসূচির আয়োজন করে। ‘বেতন বৃদ্ধি, উন্নত পেনশন ও সরকারি সেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে নতুন পথে পর্তুগাল’—এমন স্লোগানে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নামেন।
স্থানীয় সময় শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় পোর্তো ও কোইমব্রায় বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজধানী লিসবনে দুপুর আড়াইটায় কাইস দো সোদ্রে এলাকা থেকে মিছিল শুরু হয়ে রোসিও এলাকায় গিয়ে শেষ হয়।
বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে ক্ষোভ
পর্তুগালে বাড়িভাড়া, জ্বালানি এবং খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ বাড়তি খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বিক্ষোভ চলাকালে সিজিটিপির মহাসচিব তিয়াগো অলিভেইরা অভিযোগ করেন, সরকার শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক সংকট যথাযথভাবে বুঝতে পারছে না।
তিনি বলেন, মাসে এক হাজার ইউরো আয় করা একজন শ্রমিককে যদি বাড়িভাড়ার জন্যই ৮০০ থেকে ৯০০ ইউরো ব্যয় করতে হয়, তাহলে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অলিভেইরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি ও আবাসনের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বেতন ও অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
শ্রমিক সংগঠনটির অভিযোগ, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবনতিও মানুষের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। এসব খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন বিক্ষোভকারীরা।
পোর্তোয় পুলিশের অভিযানের পর উত্তেজনা
এবারের দেশব্যাপী বিক্ষোভের আগে পোর্তো শহরে আবাসন সংকট নিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের উত্তেজনা তৈরি হয়।
গত সপ্তাহে শহরের প্রাসা ডি জোয়াও এলাকায় আবাসন অধিকার নিয়ে আন্দোলন চলাকালে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে। ওই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।
পর্তুগালের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনবিষয়ক মহাপরিদর্শক দপ্তর (IGAI) পুলিশের অভিযানের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে। দেশটির সরকারি সংবাদমাধ্যম আরটিপির তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় সাতজনকে শনাক্ত করে পুলিশ।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও মতভিন্নতা দেখা দিয়েছে। ডানপন্থি চেগা দলের নেতা আন্দ্রে ভেনচুরা পুলিশের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা জোসে লুইস কার্নেইরো শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।
লিবারেল ইনিশিয়েটিভ দলের নেতা মারিয়ানা লেইতাও পুলিশের অভিযানের জবাবদিহি দাবি করেছেন। একই সঙ্গে বিক্ষোভের উত্তেজনা বাড়তে থাকলে ফ্রান্স ও আলবেনিয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
সহিংসতার হুমকির নিন্দা প্রধানমন্ত্রীর
বিক্ষোভের মধ্যে নিজের বাড়ি ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ তুলে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনেগ্রো।
শুক্রবার ব্রাসেলসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি একটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করেন। সেখানে এক বক্তাকে প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির ঠিকানা খুঁজে বের করে সেখানে ইট ছোড়ার আহ্বান জানাতে শোনা যায় বলে দাবি করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকারকে তিনি সম্মান করেন। তবে রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে সহিংসতা বা ব্যক্তিগত হুমকি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে পর্তুগালের আবাসন আন্দোলন সংগঠন মুভিমেন্তো পেলা আবিতাসাও (Movimento pela Habitação) ওই হুমকি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে। সংগঠনটি আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
লিসবনের মেয়র কার্লোস মোয়েদাসও বিক্ষোভকারীদের দাবিকে যৌক্তিক বলে স্বীকার করেছেন। তবে সব ধরনের প্রতিবাদ আইন মেনে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
দাবি আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
শনিবারের বিক্ষোভ শেষে সিজিটিপি জানিয়েছে, শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সেবার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
সংগঠনটি আগামী নভেম্বরে আরও কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৭ সালের রাষ্ট্রীয় বাজেটের চূড়ান্ত ভোটের দিন, ২৪ নভেম্বর, পার্লামেন্টের সামনে সমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পর্তুগালের চলমান আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, শনিবারের বিক্ষোভে তা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
