সুইডেনে অভিবাসীদের জন্য নতুন কঠোর আইন, রেসিডেন্সি বাতিলের ক্ষমতা বাড়ল কর্তৃপক্ষের

Sweden residency permit

সুইডেনে বসবাসরত বিদেশি নাগরিক ও নতুন অভিবাসীদের জন্য আরও কঠোর আইন অনুমোদন করেছে দেশটির পার্লামেন্ট। নতুন আইনের আওতায় ‘ভালো আচরণ’ না করলে বা নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হলে অভিবাসীদের বসবাসের অনুমতি (রেসিডেন্সি পারমিট) বাতিল করার ক্ষমতা পাবে কর্তৃপক্ষ।

সোমবার (১৫ জুন) রাতে সুইডিশ পার্লামেন্টে ভোটাভুটির মাধ্যমে আইনটি পাস হয়। আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে অভিবাসন নীতিতে সরকারের কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসনের নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থি সরকার পার্লামেন্টে অভিবাসনবিরোধী দল সুইডেন ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল।

‘ভালো আচরণ’ না করলে রেসিডেন্সি ঝুঁকিতে

নতুন আইনের আওতায় শুধু ভবিষ্যতের আবেদনকারী নয়, বর্তমানে সুইডেনে বসবাসরত অনেক বিদেশি নাগরিকও এর আওতায় পড়বেন।

চলতি বছরের মার্চে বিলটি উপস্থাপন করার সময় দেশটির অভিবাসনমন্ত্রী জোহান ফরসেল বলেছিলেন, “যারা সমাজের নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করে না, তাদের সুইডেনে থাকার অধিকার থাকা উচিত নয়।”

তবে আইনটিতে কোন ধরনের আচরণকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে গণ্য করা হবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে সরকার উদাহরণ হিসেবে কর ফাঁকি, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং উগ্রপন্থি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো উল্লেখ করেছিল।

রেসিডেন্সি পারমিট পুনর্মূল্যায়নের দায়িত্ব থাকবে সুইডিশ মাইগ্রেশন এজেন্সির ওপর। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন।

‘স্নিচ ল’ নিয়েও বিতর্ক

একই দিনে অল্প ভোটের ব্যবধানে আরেকটি বিতর্কিত আইনও পাস হয়েছে। সমালোচকদের কাছে এটি ‘স্নিচ ল’ বা ‘গুপ্তচর আইন’ নামে পরিচিত।

১৭৪ ভোটে পাস হওয়া এই আইনের বিপক্ষে ভোট পড়ে ১৭২টি। আইনটি কার্যকর হলে কিছু সরকারি সংস্থার কর্মচারীদের এমন ব্যক্তিদের বিষয়ে পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে, যাদের তারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া সুইডেনে অবস্থান করছেন বলে সন্দেহ করেন।

তবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে শিক্ষক, চিকিৎসক ও সমাজকর্মীদের এই বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে কর বিভাগ, কর্মসংস্থান সংস্থা এবং সামাজিক বীমা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের তথ্য জানাতে হবে বলে আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনা

নতুন আইনটির তীব্র সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করে বলেছে, অস্পষ্ট মানদণ্ডের কারণে এমন কাজের জন্যও কারও বসবাসের অনুমতি বাতিল হতে পারে, যা সুইডিশ নাগরিকদের ক্ষেত্রে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় না।

স্টকহোমভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা সিভিল রাইটস ডিফেন্ডারস বলেছে, আইনটি আইনের শাসনকে দুর্বল করবে এবং অভিবাসীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করবে।

সংস্থাটির মতে, কোন আচরণ বা মতামত ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে— সে বিষয়ে মানুষ নিশ্চিত থাকতে পারবে না।

স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নতুন আইন কার্যকর হলে অনিয়মিত অভিবাসীরা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তা গ্রহণে ভয় পেতে পারেন।

মালমো বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসন গবেষক জ্যাকব লিন্ড বলেন, “এটি একটি নিষ্ঠুর ও অকার্যকর নীতি। এতে মানুষ একে অপরের বিরুদ্ধে তথ্যদাতা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হবে, যা সাধারণত কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে দেখা যায়।”

তিনি আরও বলেন, এর ফলে অনিয়মিত অভিবাসীরা সমাজের আরও প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাবেন।

সরকারের অবস্থান

সমালোচনা সত্ত্বেও সুইডিশ সরকার বলছে, যাদের দেশে থাকার আইনগত অধিকার নেই, তাদের শনাক্ত করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সরকারের মতে, অভিবাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই নতুন আইনগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে।

তবে মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধী দলগুলোর দাবি, এসব আইন সমাজে ভয়, সন্দেহ এবং বৈষম্যের পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে সুইডেনের সামাজিক সংহতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।