দেশের শেয়ারবাজারের ওভার-দ্য-কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার বছরের পর বছর লেনদেনহীন থাকলেও হঠাৎ করেই আলোচনায় এসেছে আল-আমিন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি। গত ছয় মাসে কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৪ শতাংশের বেশি হাতবদল হওয়ায় নতুন করে কারসাজি, মালিকানা পরিবর্তন এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ওটিসি মার্কেটকে সাধারণত শেয়ারবাজারের ‘ডাস্টবিন’ বলা হয়। এখানে দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকা, লোকসানগ্রস্ত কিংবা কার্যত নিষ্ক্রিয় কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেন হয়। বর্তমানে ওটিসি মার্কেটে তালিকাভুক্ত ৫৬টি কোম্পানির মধ্যে ৫১টির কোনো শেয়ারই চলতি বছরের প্রথম সাড়ে চার মাসে লেনদেন হয়নি। তবে ব্যতিক্রম দেখা গেছে আল-আমিন কেমিক্যালের ক্ষেত্রে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৯ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৯ মে পর্যন্ত প্রায় ১৩ লাখ শেয়ার হাতবদল হয়েছে, যা কোম্পানির মোট শেয়ারের ৪ শতাংশেরও বেশি। এসব শেয়ার সর্বনিম্ন ৯ টাকা ৯০ পয়সা এবং সর্বোচ্চ ২০ টাকায় লেনদেন হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে খুব সীমিত সংখ্যক বিনিয়োগকারীর মধ্যে এই লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে।
হিরু ও সাকিবের মালিকানা নিয়ে নতুন আলোচনা
আল-আমিন কেমিক্যালের মালিকানায় রয়েছেন শেয়ারবাজারে আলোচিত বিনিয়োগকারী মো. আবুল খায়ের (হিরু) এবং ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। ২০২২ সালে কোম্পানিটি অধিগ্রহণের মাধ্যমে মূল বাজারে ফিরিয়ে এনে শেয়ারদর বাড়ানোর পরিকল্পনার অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুসন্ধানেও কোম্পানিটিকে ঘিরে নানা অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।
বাজারে এখন প্রশ্ন উঠেছে, সাম্প্রতিক বড় অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে কোম্পানির মালিকানা নতুন কোনো গোষ্ঠীর কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে কি না, অথবা গুঞ্জন ছড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে কি না।
তদন্তে নামছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা
ডিএসইর উপ-মহাব্যবস্থাপক ও মুখপাত্র শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, ওটিসি মার্কেটে সাধারণত বড় ধরনের লেনদেন হয় না। তাই আল-আমিন কেমিক্যালের শেয়ারে হঠাৎ সক্রিয়তা কেন দেখা যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।
অন্যদিকে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেছেন, সংস্থার সার্ভেইল্যান্স বিভাগ বিষয়টি তদন্ত করবে। কোনো বিধি-বহির্ভূত লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লোকসান কমলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে
কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে কোম্পানিটির নিট লোকসান হয়েছে ২৭ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে লোকসান ছিল ৪ কোটি ৭ লাখ টাকা। ফলে এক বছরে লোকসানের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, উৎপাদন কার্যক্রম, আর্থিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা না থাকায় এই উন্নতির পেছনের কারণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
আল-আমিন কেমিক্যালের কোম্পানি সচিব স্বপন চন্দ্র দেবনাথ দাবি করেছেন, কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম সচল রয়েছে এবং হিরু ও সাকিবের মালিকানা আগের মতোই বহাল আছে। তাদের পক্ষে আমিনুল ইসলাম সিকদার পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তবে পূর্বের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদত্যাগ করেছেন এবং বর্তমানে এম এম রফিকুজ্জামান দায়িত্ব পালন করছেন।
বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কবার্তা
শেয়ারবাজার বিশ্লেষকদের মতে, ওটিসি মার্কেটের শেয়ারে বিনিয়োগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গুঞ্জন বা সম্ভাব্য মালিকানা পরিবর্তনের খবর শুনে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য যাচাই করা জরুরি।
