ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়তেই রাজধানী ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনগুলোতে ভয়াবহ ভোগান্তির চিত্র ফুটে উঠেছে। নির্ধারিত সময়, নির্ধারিত আসন ও অতিরিক্ত ভাড়া—সবই যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে ট্রেন ছাড়ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরিতে, অতিরিক্ত যাত্রীতে উপচে পড়ছে কোচ, আর যাত্রীরা পড়ছেন চরম দুর্ভোগে।
গত চার দিন ধরে কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, ঈদযাত্রার শুরু থেকেই একের পর এক আন্তঃনগর ট্রেন বিলম্বে ছেড়ে যাচ্ছে। কোথাও ১৫ মিনিট, কোথাও আবার দেড় থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হচ্ছে। এতে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় যাত্রাপথ দীর্ঘ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টায়।
ঈদযাত্রার প্রথম দিন ২৩ মে সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাওয়া ৯টি আন্তঃনগর ট্রেনের মধ্যে সাতটিই বিলম্বে যাত্রা শুরু করে। সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকা নীলসাগর এক্সপ্রেস ছাড়ে সকাল সাড়ে ৭টায়। তিস্তা এক্সপ্রেসও নির্ধারিত সময়ের ৪০ মিনিট পর যাত্রা করে। একইভাবে বুড়িমারী এক্সপ্রেস কমলাপুরে পৌঁছায় প্রায় দেড় ঘণ্টা দেরিতে।
পরদিনও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বুড়িমারী এক্সপ্রেস আড়াই ঘণ্টার বেশি দেরিতে ঢাকা ছাড়ে। এর প্রভাব পড়ে পঞ্চগড় এক্সপ্রেসসহ অন্যান্য ট্রেন চলাচলেও। তৃতীয় দিন ধূমকেতু এক্সপ্রেস আধা ঘণ্টা এবং নীলসাগর এক্সপ্রেস প্রায় দেড় ঘণ্টা বিলম্বে যাত্রা শুরু করে। রংপুর এক্সপ্রেসও নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই ঘণ্টা পর ঢাকা ছাড়ে।
চতুর্থ দিনেও একই চিত্র দেখা গেছে। নীলসাগর ট্রেন সোয়া এক ঘণ্টা দেরিতে এবং একতা এক্সপ্রেস প্রায় ৪৫ মিনিট বিলম্বে যাত্রা শুরু করে।
শুধু বিলম্ব নয়, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপও চরম আকার ধারণ করেছে। মঙ্গলবার সকালে রাজশাহীগামী একটি ট্রেনে উঠতে না পেরে এক নারী যাত্রীকে জানালা দিয়ে কোচে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “১০ দিন আগে টিকিট কেটে যদি জানালা দিয়ে ট্রেনে উঠতে হয়, তাহলে এই ব্যবস্থার মানে কী?”
যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, এসি ও স্নিগ্ধা কোচেও অতিরিক্ত যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকছেন। ওয়াশরুম নোংরা, ফ্যান নষ্ট এবং ভাঙা সিটের মতো সমস্যাও নিয়মিত। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, টিকিটধারী যাত্রীদের আসনেও অনধিকার যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকছেন।
পঞ্চগড়ের বাসিন্দা ও নিয়মিত ট্রেনযাত্রী নুরুদ্দীন তাসলিম বলেন, “১২-১৩ ঘণ্টার যাত্রা গিয়ে দাঁড়ায় ১৮-২০ ঘণ্টায়। অতিরিক্ত টাকা দিয়েও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। এসি কোচেও লোকাল বগির মতো যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকে।”
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, যাত্রীচাহিদার তুলনায় আসনসংখ্যা কম হওয়ায় শতভাগ সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, অতিরিক্ত যাত্রীচাপের কারণে বিভিন্ন স্টেশনে ওঠানামায় বেশি সময় লাগছে। এছাড়া ছাদে যাত্রী উঠলে নিরাপত্তার কারণে ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, দেশে আন্তঃনগর ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় ৩২ হাজার যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করে আরও চার হাজার যাত্রী পরিবহনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তবে লাখ লাখ মানুষের চাহিদার তুলনায় তা এখনও অপ্রতুল।
এদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনের দীর্ঘ বিলম্ব এখন নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তার মতে, মূল সংকট হচ্ছে চাহিদার তুলনায় ট্রেন, কোচ ও লোকোমোটিভের অপ্রতুলতা।
তিনি আরও বলেন, “অতিরিক্ত ভাড়া ও সার্ভিস চার্জ নিয়েও যাত্রীরা মানসম্মত সেবা পাচ্ছেন না। নিরাপত্তা বা মানবিকতার কথা বলে সেবার মানের সঙ্গে আপস করা উচিত নয়।”
ঈদের আগে রেলের এই পরিস্থিতি নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়লেও কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমিত সক্ষমতার মধ্যেই সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
