ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্পষ্ট, বাস্তব এবং যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে প্রস্তুত রয়েছে ইউরোপের চার প্রভাবশালী দেশ—জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য। এক যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলোর নেতারা তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সোমবার (১৫ জুন) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইউরোপীয় এই চার দেশ ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখতে চায়। তবে তাদের অবস্থান স্পষ্ট—ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করতে দেওয়া যাবে না।
রোববার (১৪ জুন) রাতে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে চার দেশের নেতারা বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। এ কারণে তেহরানকে এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যা আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইযোগ্য এবং আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রস্তুত। ইউরোপীয় দেশগুলোর মতে, কেবল কূটনৈতিক সংলাপ, পর্যবেক্ষণ এবং যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতির মাধ্যমেই এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব।
ইরানের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞা দেশটির জ্বালানি, ব্যাংকিং, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ খাতকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে। তবে ইউরোপের চার দেশের সাম্প্রতিক অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেহরান যদি পারমাণবিক ইস্যুতে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহারের পথ তৈরি হতে পারে।
পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও বিবৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে। জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য হরমুজ প্রণালি দ্রুত ও বাধাহীনভাবে খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে বিবেচিত।
চার দেশের নেতারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালিতে অবাধ চলাচল বজায় রাখা জরুরি। এই নৌপথে যেকোনো ধরনের বাধা বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ, পণ্য পরিবহন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিবৃতিতে লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতিও পূর্ণ শ্রদ্ধা দেখানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে লেবাননকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকায় ইউরোপীয় দেশগুলো এই বার্তা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের এই যৌথ অবস্থান একদিকে ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগও খোলা রাখছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তুতির কথা জানালেও দেশগুলো স্পষ্ট করেছে, তার আগে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করতে হবে।
এখন নজর থাকবে তেহরানের প্রতিক্রিয়ার দিকে। ইরান যদি আইএইএর সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করে এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নেয়, তাহলে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে নতুন আলোচনার পথ আরও প্রশস্ত হতে পারে। তবে শর্ত পূরণ না হলে নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
