ইতালির রাজধানী রোমে অভিবাসন নীতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। একদিকে অভিবাসনবিরোধী সংগঠনগুলোর সমাবেশ, অন্যদিকে অভিবাসীদের অধিকার ও মানবিক নীতির পক্ষে বিশাল জনসমাবেশ—সব মিলিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে অভিবাসন প্রশ্ন।
শনিবার রোমের প্রাতি (Prati) এলাকায় অনুষ্ঠিত অভিবাসনবিরোধী মিছিলে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। একই সময়ে শহরের অন্য একটি অংশে অনুষ্ঠিত অভিবাসনপন্থী সমাবেশে কয়েক দশ হাজার মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে ইতালীয় কর্তৃপক্ষ হাজারো পুলিশ সদস্য মোতায়েন করে।
বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে ‘রিমাইগ্রেশন অ্যান্ড রিকনকোয়েস্ট’ নামে একটি বিতর্কিত আবেদন। এই আবেদনে বিদেশিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, এমনকি জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর মতো পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে আবেদনটি ৫০ হাজারের বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করায় ইতালির সংসদে বিষয়টি আলোচনার জন্য উত্থাপনের পথ তৈরি হয়েছে।
‘রিমাইগ্রেশন’ ধারণাটি দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সমালোচকদের মতে, এই ধারণা বাস্তবায়িত হলে তা জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যাপক বহিষ্কারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিক্ষোভে অংশ নিয়ে নিও-ফ্যাসিস্ট সংগঠন কাসাপাউন্ডের মুখপাত্র লুকা মার্সেলা বলেন, “আমরা অবৈধ অভিবাসীদের দেশ থেকে বের করে দিতে চাই। এমনকি যারা বৈধভাবে এসেছে কিন্তু সমাজের সঙ্গে একীভূত হতে পারেনি, তাদেরও নিজ দেশে ফিরে যাওয়া উচিত।”
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিছিল চলাকালে কিছু অংশগ্রহণকারী ফ্যাসিবাদী স্যালুট প্রদর্শন করেন এবং ইতালির সাবেক স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির প্রতি সমর্থন জানিয়ে স্লোগান দেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট সরকারের জন্য বিষয়টি একটি রাজনৈতিক ভারসাম্যের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জোটের শরিক লীগ পার্টি সংসদে প্রস্তাবটি আলোচনার পক্ষে থাকলেও মেলোনির দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’ এবং তাদের মধ্যপন্থী মিত্ররা এখনো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বিরোধী দল, মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রস্তাবটি ইতালির সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক বৈষম্যবিরোধী নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে জাতিগত বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে লক্ষ্যবস্তু করা আইনের শাসনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
বামপন্থী রাজনীতিক অ্যাঞ্জেলো বোনেলি বলেন, “রিমাইগ্রেশন বিল এমন এক বর্জনমূলক নীতির প্রতিফলন, যা ইতালির সংবিধান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”
তবে একই সময়ে মেলোনি সরকার বৈধ অভিবাসন সম্প্রসারণের দিকেও এগোচ্ছে। শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে কয়েক লাখ শ্রমিককে বৈধভাবে ইতালিতে কাজের সুযোগ দেওয়ার জন্য একটি বহুবর্ষী পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে সরকার।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে শ্রমঘাটতি পূরণে বিদেশি কর্মী প্রয়োজন, অন্যদিকে অবৈধ অভিবাসন নিয়ে জনমতের চাপ—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ইতালীয় সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
