পর্তুগালে অভিবাসন আইনে কড়াকড়ি, বাড়ছে ডিপোর্ট ও আটকের সুযোগ

portugal-deportation-law

পর্তুগালে অনিয়মিত অবস্থানে থাকা বিদেশিদের ফেরত পাঠানো, আশ্রয় আবেদন এবং আটকের নিয়মে বড় পরিবর্তন এসেছে। বহুল আলোচিত নতুন ‘রিটার্ন ও অ্যাসাইলাম’ আইনে ডিপোর্ট বা জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া দ্রুত করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিদেশিদের দীর্ঘ সময় আটক রাখার সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে আশ্রয়ের আবেদন করলেই প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে থেমে যাবে—আগের সেই সুযোগও সীমিত করা হয়েছে।

পর্তুগালের পার্লামেন্টে অনুমোদনের পর আইনটির কয়েকটি বিধান নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন ওঠে। প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও জোসে সেগুরো ১১টি বিধান পর্যালোচনার জন্য সাংবিধানিক আদালতে পাঠান। ২৮ আগস্ট আদালত পর্যালোচনা করা বিধানগুলোকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেনি। এরপর ৩১ আগস্ট প্রেসিডেন্ট আইনটিতে স্বাক্ষর করেন।

তবে নতুন আইনের অর্থ এই নয় যে পর্তুগালে থাকা সব বিদেশি বা বৈধ রেসিডেন্স পারমিটধারীকে ডিপোর্ট করা হবে। পরিবর্তনগুলো মূলত অনিয়মিত অবস্থান, প্রত্যাবর্তন, সীমান্ত প্রক্রিয়া এবং আশ্রয়সংক্রান্ত নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য।

৬০ দিনের বদলে সর্বোচ্চ ৩৬০ দিন পর্যন্ত আটক

নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ায় আটকের সময়সীমা বৃদ্ধি।

সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদেশিকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় আটকের সর্বোচ্চ সময় আগের ৬০ দিন থেকে বাড়ানো হয়েছে। নতুন কাঠামোয় সাধারণভাবে ১৮০ দিন পর্যন্ত আটক রাখা সম্ভব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করলে তা সর্বোচ্চ ৩৬০ দিন পর্যন্ত যেতে পারে।

তবে আটক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নয়। সরকার নিজেই এটিকে শেষ অবলম্বন হিসেবে বর্ণনা করেছে। জামানত দেওয়া, ভ্রমণ নথি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা রাখা বা নির্দিষ্ট ব্যবস্থার অধীনে থাকার মতো বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

সাংবিধানিক আদালতও আটককে ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণের ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকার করে বিচারিক তদারকিসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে।

দ্রুত হতে পারে ডিপোর্ট প্রক্রিয়া

নতুন আইনের অন্যতম লক্ষ্য হলো অনিয়মিত অবস্থানে থাকা বিদেশিদের বিরুদ্ধে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে যে দীর্ঘসূত্রতা ছিল, তা কমানো।

সরকার এর আগে বলেছিল, ‘Notificação para Abandono Voluntário’ বা স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের নোটিশের বর্তমান ধাপটি বাদ দিয়ে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত কার্যকর করার ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে পুরো রিটার্ন প্রক্রিয়ার দায়িত্ব PSP-এর Unidade Nacional de Estrangeiros e Fronteiras (UNEF)-এর অধীনে কেন্দ্রীভূত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

সরকারের দাবি, আগের ব্যবস্থায় অনিয়মিত অবস্থানে থাকা বিদেশিদের প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার খুব কম ছিল। মন্ত্রী আন্তোনিও লেইতাও আমারো বলেছেন, একসময় পর্তুগালে এ ধরনের প্রত্যাবর্তন কার্যকর করার হার ৫ শতাংশের নিচে ছিল। এটি সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যান ও ব্যাখ্যা।

আশ্রয় আবেদন করলেই ডিপোর্ট প্রক্রিয়া বন্ধ নয়

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে আশ্রয় বা আন্তর্জাতিক সুরক্ষা আবেদনের ক্ষেত্রে।

সরকারের সংস্কার অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া চলার সময় তিনি আশ্রয়ের আবেদন করলে শুধু সেই কারণে প্রত্যাবর্তনের পুরো প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত থাকবে না। আশ্রয় এবং প্রত্যাবর্তনসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সমান্তরালভাবে এগোতে পারে।

সরকারের যুক্তি, আশ্রয় ব্যবস্থাকে শুধু প্রত্যাবর্তন বিলম্বিত করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার ঠেকানো প্রয়োজন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বৈধ আশ্রয়প্রার্থী বা আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিকে সুরক্ষা ছাড়াই সরাসরি ফেরত পাঠানো যাবে। সাংবিধানিক আদালত জানিয়েছে, প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে অন্তর্বর্তী বিচারিক সুরক্ষা চাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে এবং non-refoulement বা এমন দেশে কাউকে ফেরত না পাঠানোর নীতি মানতে হবে, যেখানে তিনি নিপীড়ন বা গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

পরিবার ও শিশুদের ক্ষেত্রেও আদালতের সুরক্ষা

নতুন আইনের কিছু বিধান নিয়ে প্রেসিডেন্টের বড় উদ্বেগ ছিল পরিবার ও শিশুদের অধিকার।

বিশেষ করে পর্তুগালে জন্ম নেওয়া শিশু, পর্তুগিজ নাগরিক সন্তান থাকা বিদেশি বাবা-মা, বাবা-মা ও সন্তানের বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়া ব্যক্তিদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়গুলো সাংবিধানিক আদালতের সামনে তোলা হয়েছিল।

আদালত পর্যালোচনা করা বিধানগুলোকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেনি, তবে সেগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা ও সুরক্ষার কথা বলেছে। প্রেসিডেন্টের দপ্তরও জানিয়েছে, আদালতের সিদ্ধান্ত পর্তুগালে জন্ম নেওয়া শিশু, পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষার অধিকারীদের প্রত্যাবর্তনের মতো বিষয়ে কর্তৃপক্ষ ও আদালতের জন্য ব্যাখ্যামূলক নির্দেশনা দিয়েছে।

বিদেশিদের ওপর নজরদারিও বাড়ছে

আইনি পরিবর্তনের পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকদের অবস্থান যাচাইয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতাও বেড়েছে।

লুসার পাওয়া GNR-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত পর্তুগালে ২১ হাজার ৫৬৭ বিদেশি নাগরিককে বিভিন্ন অভিযানে যাচাই করা হয়েছে। এ সময়ে ২৩২ জনকে আটক, প্রায় ১ হাজার ৫০০টি প্রশাসনিক লঙ্ঘনের প্রতিবেদন এবং ৩৪৮টি স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

তবে এই ২৩২টি আটককে নতুন রিটার্ন আইনের অধীনে ‘ডিপোর্টের জন্য আটক’ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। GNR-এর প্রকাশিত সামগ্রিক enforcement পরিসংখ্যান এটি।

AIMA ও রেসিডেন্স পারমিট নবায়নের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন—পর্তুগালে AIMA অনলাইন রেসিডেন্স পারমিট নবায়ন সেবা

বৈধ প্রবাসীদের জন্য এর অর্থ কী

নতুন আইন নিয়ে পর্তুগালে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ অভিবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে বৈধ রেসিডেন্স পারমিট থাকা, সময়মতো নবায়নের প্রক্রিয়ায় থাকা এবং পর্তুগালে থাকার আইনি অধিকার রয়েছে—এমন প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর নতুন ডিপোর্ট ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়।

সরকারও বলেছে, নতুন প্রত্যাবর্তন ব্যবস্থা মূলত যারা অনিয়মিতভাবে দেশে প্রবেশ করেছেন বা বৈধ থাকার অধিকার হারিয়েছেন, তাদের পরিস্থিতিকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার বৈধ অভিবাসন ও অনিয়মিত অভিবাসনের মধ্যে পার্থক্য করার কথা বলছে।

পর্তুগাল সরকার ২০২৪ সালে ‘manifestação de interesse’ ব্যবস্থা বন্ধ করার পর থেকে অভিবাসন কাঠামোয় ধারাবাহিক পরিবর্তন করছে। সরকারের হিসাবে, ২০২৫ সালে নতুন বিদেশি বাসিন্দা বৃদ্ধির সংখ্যা ছিল ৫৯ হাজার ১১৩; ২০২২ ও ২০২৩ সালে এই বৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯০ এবং ২ লাখ ৭৫ হাজার ৯২৯।

ফলে রেসিডেন্স পারমিটের মেয়াদ শেষ, নবায়ন আবেদন, AIMA-তে চলমান প্রক্রিয়া, আশ্রয় আবেদন বা কোনো প্রত্যাবর্তন নোটিশ—প্রতিটি পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কেবল কার্ডের মেয়াদ বা প্রশাসনিক বিলম্ব দেখে কাউকে ‘অবৈধ’ ধরে নেওয়া ঠিক নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বর্তমান আইনি অবস্থাই নির্ধারক।