‘২৪-এর ৫ আগস্ট: কী ঘটেছিল সেদিন, ফিরে দেখা ঐতিহাসিক দিনটি

5-august-2024-bangladesh

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। কয়েক সপ্তাহের আন্দোলন, সংঘাত ও রাজনৈতিক উত্তেজনার পর সেদিন দেশের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দিনটি ছিল ঘটনাবহুল।

সকাল থেকেই রাজপথে মানুষের ঢল

৫ আগস্ট সকালে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে মানুষ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর দিকে এগিয়ে আসেন।

আগের দিন আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে ‘ঢাকা অভিমুখে যাত্রা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে।

দুপুরে বদলে যায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি

৫ আগস্ট দুপুরের দিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের খবর সামনে আসে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন বলে জানা যায়।

এরপর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

এই ঘোষণার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

গণভবন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় মানুষের প্রবেশ

শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকার গণভবনের দিকে এগিয়ে যান। একপর্যায়ে সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশের ঘটনাও ঘটে।

গণভবনের বিভিন্ন স্থানে মানুষের ভিড় দেখা যায়। একই সময়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিজয় মিছিল ও আনন্দ-উল্লাসের খবর পাওয়া যায়।

তবে দিনটিতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। সরকারি ও রাজনৈতিক স্থাপনা ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার খবর পাওয়া যায়।

সহিংসতায় প্রাণহানিও ঘটে

৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও সহিংসতা ঘটে। এতে সাধারণ মানুষ, আন্দোলনকারী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ বহু মানুষ হতাহত হন।

দিনটির ঘটনাবলি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে ৫ আগস্টের আগে ও পরে সংঘটিত সহিংসতা, প্রাণহানি এবং বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনাগুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে তদন্ত ও রাজনৈতিক বিতর্কও অব্যাহত থাকে।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া

৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার সূচনা হয়। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা জানানো হয়।

পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দল, ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূনের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় এবং ৮ আগস্ট তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শুধু একটি সরকারের পতনের দিন নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তনের দিন। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী ব্যাপক আন্দোলনে রূপ নেয়। জুলাই ও আগস্টজুড়ে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহের পর ৫ আগস্ট এসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে।

সেই কারণে দিনটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। তবে ৫ আগস্টের ঘটনাগুলো মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আন্দোলনের পূর্বাপর পরিস্থিতি, প্রাণহানি, সহিংসতা, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ—সবকিছুকেই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।