ঢাকা: দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবারও সরাসরি ভোটাভুটি হতে যাচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটে ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হবেন দেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। দীর্ঘ সময় পর একাধিক প্রার্থী থাকায় এবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সুযোগ নেই। ফলে সংসদ সদস্যদের ভোটেই নির্ধারিত হবে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান।
দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বশেষ ভোটাভুটি হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এরপর সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালুর পর পরবর্তী সাতজন প্রেসিডেন্টই ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
এবার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম।
ভোটার ৩৪৯ সংসদ সদস্য
জাতীয় সংসদের মোট আসন ৩৫০টি। তবে একটি আসন শূন্য থাকায় এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেবেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য।
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেবল জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যরাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন।
বর্তমান সংসদে বিএনপির ২৪৭ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জন, স্বতন্ত্র ৮ জন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৮ জন সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৩ জন এবং অন্যান্য কয়েকটি দলের একজন করে সদস্য রয়েছেন।
সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাল্লাই ভারী। এ ছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারানোর বিধান রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে তাঁর বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন এবার ভোটাভুটি
গত ২৪ জুলাই শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ২২তম প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে পদটি শূন্য হয়।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে হয়। এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন গত ৬ আগস্ট নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে।
১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় শেষ হওয়ার পর দুই বৈধ প্রার্থীই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকেন। ফলে আইন অনুযায়ী ব্যালটে ভোটগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়।
নির্বাচন কমিশনের সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, একাধিক বৈধ প্রার্থী বহাল থাকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আইন, ১৯৯১ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী ভোটগ্রহণ করা হবে।
যেভাবে হবে ভোট
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সংসদ সদস্যদের হাতে সরাসরি ব্যালট পেপার দেওয়া হবে। ব্যালটের একটি অংশে থাকবে ভোটারের পরিচিতিসংক্রান্ত তথ্য এবং অন্য অংশে থাকবে দুই প্রার্থীর নাম।
ভোটাররা পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত ঘরে পূর্ণ স্বাক্ষর করে ভোট দেবেন। ৩৪৯ জন ভোটারের জন্য সমসংখ্যক ব্যালট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজনের জন্য অতিরিক্ত কিছু ব্যালটও রাখা হবে।
ইসির প্রায় ২০ জন কর্মকর্তা ভোটগ্রহণের সময় সংসদ কক্ষে দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণের কারিগরি ও আইনি প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘদিন এ ধরনের নির্বাচন না হওয়ায় প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে কমিশন মহড়াও করেছে।
ভোট গণনা হবে সংসদ কক্ষেই
বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর সংসদ কক্ষেই ব্যালট বাক্স খোলা হবে। সংসদ সদস্য ও প্রার্থীদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ভোট গণনা করা হবে।
বৈধ ও অবৈধ ব্যালট আলাদা করে গণনা শেষে প্রত্যেক প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন এবং কতটি ভোট বাতিল হয়েছে, তা জানানো হবে। বৈধ ভোটের মধ্যে সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে।
এরপর নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের নাম উল্লেখ করে সরকারি গেজেট প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটাভুটির এই আয়োজনকে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকায় ভোটের আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে খুব বেশি অনিশ্চয়তা নেই।
