ফ্রান্স থেকে পরিকল্পনা, ঢাকায় ২৬০ ভরি সোনা চুরি

france-masterplan-dhaka-gold-theft

ফ্রান্সে বসে পরিকল্পনা ও অর্থায়ন করে ঢাকার একটি স্বর্ণের মার্কেটে কয়েক কোটি টাকার সোনা চুরির অভিযোগ উঠেছে সৈয়দ নাসির নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। পুলিশ বলছে, ‘ফ্রান্স নাসির’ নামে পরিচিত ওই ব্যক্তির পরিকল্পনা দেশে বাস্তবায়ন করতেন তার প্রাক্তন শ্যালক শামীম খান। চক্রটি ভুয়া পরিচয়ে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি নিয়ে দীর্ঘদিন তথ্য সংগ্রহের পর চুরির ঘটনা ঘটায়।

রাজধানীর মিরপুরের মাজার রোডে হযরত শাহআলী শপিং কমপ্লেক্সের দুটি সোনার দোকানে চুরির তদন্তে এসব তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ২৫ জুলাই দিবাগত রাতে মার্কেটের এ হোসেন জুয়েলার্স ও আল রাজ্জাক জুয়েলার্স থেকে প্রায় ২৬০ ভরি স্বর্ণালংকার এবং নগদ ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা চুরি হয়। চুরি হওয়া স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

তবে চুরি হওয়া স্বর্ণের পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর পরিমাণ ৫০ থেকে ৬০ ভরিও হতে পারে। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

ভুয়া পরিচয়ে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি

গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, চক্রটির প্রথম কৌশল ছিল ভুয়া নাম, নকল জাতীয় পরিচয়পত্র, ভুয়া জন্মনিবন্ধন এবং অন্যের নামে নিবন্ধিত মুঠোফোন নম্বর ব্যবহার করে মার্কেটে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি নেওয়া।

প্রথমে চক্রের একজন সদস্য নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে মার্কেটে প্রবেশ করতেন। পরে তার সহযোগিতায় আরও পাঁচ থেকে ছয়জনকে একই মার্কেটে নিয়োগ দেওয়া হতো। পরিচয়পত্রে ব্যবহৃত ছবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হলেও নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য ছিল ভুয়া।

নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্ব পালনের সময় তারা মার্কেটের সিসিটিভি ক্যামেরার অবস্থান, রাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা, দোকানের তালা এবং কোন দোকানে কী পরিমাণ স্বর্ণ রাখা হয়—এসব তথ্য সংগ্রহ করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

দেড় মাস ধরে চলে পরিকল্পনা

শাহআলী মার্কেটকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করার পর চক্রটি প্রায় দেড় মাস ধরে সেখানে তথ্য সংগ্রহ ও চুরির প্রস্তুতি নেয়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, চক্রের সদস্যরা দিনের পরিবর্তে ধীরে ধীরে রাতের পালায় দায়িত্ব নেওয়া শুরু করেন।

এ সময় তারা মার্কেটের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং দোকানগুলোর স্বর্ণ রাখার পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করেন। চুরি সহজ করতে দিনের বেলাতেই কাটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম মার্কেটের শৌচাগার বা অন্য কোনো গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখা হতো।

ঘটনার রাতে ভেতরে থাকা ছদ্মবেশী নিরাপত্তাকর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর বাইরের সদস্যরা মার্কেটে প্রবেশ করেন। পরে দোকানের তালা কেটে স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়া হয়।

ফ্রান্স থেকে অর্থ দিতেন নাসির

গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটির পরিকল্পনা ও অর্থায়নের মূলে ছিলেন সৈয়দ নাসির। দীর্ঘদিন ফ্রান্সে বসবাস করায় তিনি ‘ফ্রান্স নাসির’ নামে পরিচিত।

অভিযোগ রয়েছে, চক্রের সদস্যদের বাসাভাড়া, দৈনন্দিন খরচ এবং চুরির সরঞ্জাম কেনার অর্থ নাসির সরবরাহ করতেন। দেশে কোন মার্কেটকে লক্ষ্য করা হবে, প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় লোক জোগাড়ের দায়িত্ব পালন করতেন তার প্রাক্তন শ্যালক শামীম খান।

নাসিরের সঙ্গে শামীমের বোনের বৈবাহিক সম্পর্কের বিচ্ছেদ হলেও তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও আর্থিক সম্পর্ক বজায় ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মিষ্টি খাইয়ে নিরাপত্তাকর্মীকে অচেতন

চুরির রাতে ওই তলার দায়িত্বে থাকা তোফাজ্জল হোসেন নামে এক নিরাপত্তাকর্মীকে মিষ্টির সঙ্গে চেতনানাশক খাইয়ে অচেতন করে দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

সিসিটিভি ফুটেজে চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে তাকে কিছু খেতে দেখা যায়। এর কিছুক্ষণ পর তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। সকালে পুলিশ ও ব্যবসায়ীরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর তার চেতনা ফেরে।

তোফাজ্জলের ভাষ্য অনুযায়ী, এক নিরাপত্তাকর্মীর আত্মীয়ের সন্তান হওয়ার কথা বলে সবাইকে মিষ্টি দেওয়া হয়েছিল। মিষ্টি খাওয়ার পর তিনি চা তৈরি করেন। এরপর কী ঘটেছে, তা আর মনে করতে পারেননি।

চার দোকানে চুরির চেষ্টা

ঘটনার রাতে চক্রটি চারটি সোনার দোকানে চুরির চেষ্টা চালিয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে এ হোসেন জুয়েলার্স ও আল রাজ্জাক জুয়েলার্সের তালা কেটে স্বর্ণ নিয়ে যেতে সক্ষম হয় তারা।

নিউ প্রিন্স জুয়েলার্সের কয়েকটি তালা ভাঙলেও শেষ তালাটি কাটতে না পারায় দোকানটি রক্ষা পায়। নুপুর জুয়েলার্সের তালা ও শিকল কাটার চেষ্টা করেও চক্রটি সফল হয়নি।

ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, শুধু এ হোসেন জুয়েলার্স থেকেই প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ তিন লাখ টাকা চুরি হয়েছে। আল রাজ্জাক জুয়েলার্স থেকে প্রায় ৬০ ভরি স্বর্ণ চুরির দাবি করা হয়েছে।

দেশের বাজারে চুরি হওয়া স্বর্ণের সম্ভাব্য মূল্য বুঝতে সর্বশেষ সোনার দাম দেখা যেতে পারে। তবে পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত অঙ্ক নিশ্চিত নয়।

চুরির পর ভেঙে ফেলা হয় মুঠোফোন

চুরির পর চক্রের সদস্যরা সরাসরি নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাননি। আগে থেকে ভাড়া নেওয়া একটি নিরাপদ বাসায় তারা অবস্থান করেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে চুরি করা মালামাল ভাগ করার পরিকল্পনা ছিল।

পুলিশের দাবি, ঘটনার পর ব্যবহৃত মুঠোফোন সংগ্রহ করে ভেঙে ফেলেন শামীম। চক্রের সদস্যদের তিন থেকে চার মাস মুঠোফোন ব্যবহার না করতে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গণমাধ্যমের খবর পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছিল।

গ্রেপ্তার ১১, উদ্ধার প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণ

পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চক্রটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছয় সদস্যের পাশাপাশি সহযোগিতার অভিযোগে আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা ও থানা পুলিশ।

দুই মাস আগে দেশে আসা সৈয়দ নাসির ও তার প্রাক্তন শ্যালক শামীম খানকেও তথ্যপ্রযুক্তি এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ভুয়া পরিচয়ে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া পাঁচজনের মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাসু সাহা নামে একজন এখনো পলাতক। জাল কাগজপত্র তৈরির অভিযোগে কাউসার ওরফে কাউসার মাস্টার এবং তালা কাটার দায়িত্বে থাকা রাজা মিয়াকেও খুঁজছে পুলিশ।

তদন্তকারীরা এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালংকার এবং প্রায় আধা কেজি নকল অলংকার উদ্ধার করেছেন।

আরও কয়েকটি চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহ

গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে কচুক্ষেত, হাতিরঝিল, রামপুরা, দক্ষিণখান, ডেমরা ও মালিবাগের কয়েকটি চুরিতেও একই ধরনের কৌশল ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।

ঢাকায় নিরাপত্তাকর্মীর ছদ্মবেশে সক্রিয় আরও দুই থেকে তিনটি চক্র রয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। ভুয়া কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানকেও তদন্তের আওতায় আনার কথা জানানো হয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলেছেন, চক্রটির পলাতক সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং চুরি হওয়া বাকি স্বর্ণ উদ্ধারে অভিযান চলছে। অভিযোগগুলো তদন্তাধীন এবং আদালতের রায়ের আগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে গণ্য করার সুযোগ নেই।