ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম বড় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অঞ্চলটিতে বর্তমানে ৫৫২ গিগাওয়াট সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে অথবা উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৭৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রায় ৬৮৩ বিলিয়ন ইউরোর সমান। এই নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে নেতৃত্ব দিচ্ছে স্পেন।
জ্বালানি অবকাঠামো পর্যবেক্ষণকারী গবেষণা সংস্থা Global Energy Monitor-এর সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত নতুন বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির গ্লোবাল ইন্টিগ্রেটেড পাওয়ার ট্র্যাকারের তথ্য ব্যবহার করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পরিকল্পিত সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের এই সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের পরিকল্পিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার চেয়েও কিছুটা বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে পরিকল্পিত মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫৪৮ দশমিক ৩ গিগাওয়াট।
২০৩০ সালের মধ্যেই আসতে পারে ৩৬১ গিগাওয়াট
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের পরিকল্পিত সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৩৬১ দশমিক ৩ গিগাওয়াট, ২০৩০ সালের শেষ নাগাদ বাণিজ্যিকভাবে চালু করার লক্ষ্য রয়েছে।
বর্তমানে অঞ্চলটিতে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মোট চালু সক্ষমতা প্রায় ২৫১ দশমিক ৬ গিগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ১৫০ দশমিক ৭ গিগাওয়াট এবং বায়ুবিদ্যুৎ ১০০ দশমিক ৯ গিগাওয়াট। নতুন প্রকল্পগুলো পরিকল্পনামতো বাস্তবায়িত হলে অঞ্চলটির চালু সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তবে ঘোষিত সব প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়িত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। গ্লোবাল এনার্জি মনিটর বলছে, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার মতো বাধা অতিক্রম করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
ইউরোপে এগিয়ে স্পেন
নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই যাত্রায় ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে স্পেন।
গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের হিসাবে, স্পেনে পরিকল্পিত বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সক্ষমতা ১০৮ দশমিক ৮ গিগাওয়াট। এ ক্ষেত্রে ইউরোপে দেশটির অবস্থান প্রথম।
অন্যদিকে পরিকল্পিত বায়ুবিদ্যুৎ সক্ষমতা ৫৬ দশমিক ৫ গিগাওয়াট। এই সূচকে যুক্তরাজ্য ও সুইডেনের পর ইউরোপে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে স্পেন।
বর্তমানে স্পেনে প্রায় ৮ দশমিক ৪ গিগাওয়াট বড় আকারের সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণাধীন। আরও ১৩২ গিগাওয়াট প্রকল্প নির্মাণপূর্ব পর্যায়ে রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিলে সুফল পাচ্ছেন স্পেনের মানুষ
সৌর ও বায়ুবিদ্যুতে বড় বিনিয়োগের সুফল স্পেনের সাধারণ গ্রাহকদের কাছেও পৌঁছাতে শুরু করেছে।
গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত Ember-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিদ্যুতের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখায় স্পেনের একটি গড় পরিবার মাসে প্রায় ১০ ইউরো বা প্রায় ১৯ শতাংশ বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় করছে।
সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসসহ জীবাশ্ম জ্বালানির দামের অস্থিরতার প্রভাব থেকেও দেশটির বিদ্যুৎ খাত তুলনামূলক সুরক্ষা পাচ্ছে।
মিসরেও প্রায় ১০০ গিগাওয়াটের প্রকল্প
ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণ দিকেও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। উত্তর আফ্রিকায় এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে মিসর।
দেশটিতে প্রায় ১০০ গিগাওয়াট সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিকল্পনা বা উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ দশমিক ৭ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা সরাসরি সবুজ হাইড্রোজেন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত।
স্পেন ও মিসরের পাশাপাশি গ্রিস, ইতালি, মরক্কো, ফ্রান্স এবং পশ্চিম সাহারাতেও বড় আকারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বড় বাধা পুরোনো বিদ্যুৎ গ্রিড
শুধু সৌর প্যানেল বা বায়ু টারবাইন স্থাপন করলেই এই বিপুল পরিকল্পনার সুফল পাওয়া যাবে না। উৎপাদিত বিদ্যুৎ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে শক্তিশালী সঞ্চালন ও আন্তসংযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
গ্লোবাল এনার্জি মনিটর বলছে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অনেক জায়গায় বর্তমান বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও আন্তসংযোগ অবকাঠামো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে স্পেন ও গ্রিসে উৎপাদিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের একটি অংশ গ্রিডের সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
প্রতিবেদনের লেখক ও গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের জ্যেষ্ঠ গবেষক হেইলি ডেরেসের মতে, অঞ্চলটির দেশগুলো জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে শূন্য থেকে শুরু করছে না। ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে গ্রিড অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং অনুমোদনের মতো বাধা কতটা কাটানো যাবে, তার ওপরই পরিকল্পিত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে।
কপ৩১-এর আগে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতিসংঘের কপ৩১ জলবায়ু সম্মেলনের আগে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো। গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের মতে, সম্মেলনটি ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ইতিমধ্যে অর্জিত অগ্রগতি তুলে ধরা এবং আন্তদেশীয় সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে।
তবে ৫৫২ গিগাওয়াটের পুরোটা এখনো উৎপাদনে আসেনি। এর মধ্যে ঘোষিত, নির্মাণপূর্ব এবং নির্মাণাধীন প্রকল্প রয়েছে। ফলে এটিকে বর্তমানে চালু নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য বা পরিকল্পিত সক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণটি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে Euronews। আর মূল তথ্য ও প্রকল্পভিত্তিক বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে Global Energy Monitor-এর মূল প্রতিবেদনে।
