জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ আজ, সংঘর্ষের আশঙ্কায় কড়া নিরাপত্তা

France living protest

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চ দাম এবং সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে শনিবার (১৭ অক্টোবর) ফ্রান্সজুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিক্ষোভকারীরা। সম্ভাব্য সংঘর্ষের আশঙ্কায় প্যারিসসহ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে সরকার।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ইউরোনিউজ জানিয়েছে, শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৫০০টি কর্মসূচি এবং অন্তত ৯০টি বিক্ষোভ হতে পারে। একই সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বড় একটি অংশ আজকের কর্মসূচিতে যোগ দিতে পারে।

রয়টার্স জানিয়েছে, শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠনের সদস্য এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীসহ কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার মানুষ বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নামতে পারেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, সরকারি সেবার দুর্বলতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সমস্যা এবং সামাজিক বৈষম্য।

প্যারিসসহ বড় শহরে সংঘর্ষের আশঙ্কা

১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভকে সামনে রেখে প্যারিসসহ বড় শহরগুলোতে অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে কিছু সহিংস গোষ্ঠী পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে পারে কিংবা বিক্ষোভের নির্ধারিত নিরাপত্তাবেষ্টনী ভাঙার চেষ্টা করতে পারে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রটি ইউরোনিউজকে জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনপথ ও জরুরি অবকাঠামো অবরোধের চেষ্টা হলে তা সহ্য করা হবে না। তবে সম্ভাব্য সহিংসতার জন্য কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দায়ী করার সরকারি আশঙ্কাগুলো এখনো পূর্বাভাসমাত্র।

শুক্রবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেন, প্রতিবাদ করার অধিকার পুরোপুরি স্বীকৃত, তবে সেই অধিকার প্রয়োগের সময় মানুষ ও সম্পদের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে হবে। শান্তি ও সংযম বজায় রাখার আহ্বানও জানান তিনি।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে বড় বিক্ষোভ

ফ্রান্সে প্রায় চার সপ্তাহ ধরে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। শিক্ষক সংকট, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস পরিচালনা, জরাজীর্ণ ভবন ও অপর্যাপ্ত শিক্ষা সুবিধা নিয়ে তাদের ক্ষোভ শুরু হয়।

পরে আন্দোলনটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। গত ১৩ অক্টোবরের কর্মসূচিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিল। আয়োজকদের দাবি ছিল প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার।

অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ হলেও কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্দোলনের প্রথম কয়েক সপ্তাহে কয়েক হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে, যাদের বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ফরাসি পুলিশের ব্যবহৃত কৌশল ও অস্ত্র নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কয়েকজন কিশোর গুরুতর আহত হওয়ার পর পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে।

ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি ঘটনায় এক কিশোর পুলিশের রাবার বুলেটে চোখে গুরুতর আঘাত পেয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অন্য একটি ঘটনায় পুলিশের ব্যবহৃত স্টান গ্রেনেডের কারণে এক কিশোরের হাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি তদন্তাধীন।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজ সিনেটে জানিয়েছেন, শিক্ষার্থী বিক্ষোভের সময় পুলিশের কথিত সহিংসতার অভিযোগে ৩৬টি তদন্ত শুরু হয়েছে। গুরুতর আঘাতের কয়েকটি ঘটনাও এসব তদন্তের আওতায় রয়েছে।

কিছু ধরনের স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার শিক্ষার্থী বিক্ষোভে স্থগিত রাখা হলেও শনিবার গুরুতর সহিংসতা দেখা দিলে পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছু দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ থাকবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

৯ শতাধিক পুলিশ ও জেন্ডার্ম আহত

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বৃহস্পতিবার জানান, সাম্প্রতিক বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ৯৩৭ জন পুলিশ ও জেন্ডার্ম আহত হয়েছেন। একই সময়ে ২৪৮ শিক্ষার্থী ও ১৪৯ জন শিক্ষা কর্মকর্তা বা কর্মচারী আহত হয়েছেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

লেকর্নু সতর্ক করে বলেছেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একাংশ ধীরে ধীরে ‘শহুরে সহিংসতার’ দিকে যাচ্ছে। শনিবারের বিক্ষোভেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে সরকার মনে করছে।

ফিরছে কি ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন?

শনিবারের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সে আবারও আলোচনায় এসেছে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা ‘জিলে জোন’ আন্দোলন। ২০১৮ সালে জ্বালানি কর বাড়ানোর পরিকল্পনার প্রতিবাদে আন্দোলনটির সূচনা হয়েছিল। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামাজিক বৈষম্যসহ বিভিন্ন দাবিতে এটি বড় সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।

সেই সময় বিক্ষোভকারীরা প্রতি সপ্তাহান্তে মহাসড়ক, গোলচত্বর ও জ্বালানি ডিপো অবরোধ করতেন। প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষও হয়েছিল।

সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী আন্দোলন এবং ১৭ অক্টোবরের জীবনযাত্রার ব্যয়বিরোধী কর্মসূচির মধ্যে সংযোগ তৈরির চেষ্টা চলছে। ফ্রান্সের অন্যতম বড় শ্রমিক সংগঠন CGT-ও শনিবারের আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই নতুন আন্দোলন

নতুন বিক্ষোভ এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ফ্রান্স উচ্চ সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে চাপের মুখে রয়েছে। পার্লামেন্টে ২০২৭ সালের বাজেট নিয়ে আলোচনা চলছে এবং ব্যয়সংকোচনের বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে শিক্ষা খাতে আরও অর্থ বরাদ্দের দাবি জানানো হচ্ছে। সরকার জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য অতিরিক্ত ১.২ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের প্রস্তাব দিলেও আন্দোলনকারীদের একটি অংশ সেটিকে পর্যাপ্ত মনে করছে না।