পর্তুগালে নাগরিকত্বের ৬ লাখ ৯০ হাজার আবেদন ঝুলে আছে

Portugal citizenship application

পর্তুগালে নাগরিকত্বের জন্য জমা পড়া প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার আবেদন এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। দেশটির ইনস্টিটিউট অব রেজিস্ট্রিজ অ্যান্ড নোটারিজ—আইআরএনের (IRN) হিসাবে, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মোট ৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০টি নাগরিকত্ব আবেদন বকেয়া ছিল।

এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা ৩৮ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের জুনে প্রায় পাঁচ লাখ আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। পর্তুগালের বিচার মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে দেশটির দৈনিক পুবলিকো এ তথ্য জানিয়েছে।

তবে বকেয়া আবেদনগুলোর সবই পর্তুগালে বসবাসরত অভিবাসীদের নয়। মোট আবেদনের মাত্র ২৬ শতাংশ এমন বিদেশিদের, যারা পর্তুগালে বৈধভাবে বসবাসের সময়সীমা পূর্ণ করার ভিত্তিতে নাগরিকত্ব চেয়েছেন।

কোন ধরনের আবেদন কত

আইআরএনের বকেয়া আবেদনের হিসাব অনুযায়ী, পর্তুগালে বসবাসরত অভিবাসীদের বৈধ আবাসনের ভিত্তিতে করা আবেদন মোট বকেয়ার ২৬ শতাংশ।

এর বাইরে প্রায় ২৩ শতাংশ আবেদন পর্তুগিজ সেফার্ডিক ইহুদিদের বংশধরদের পুরোনো ব্যবস্থার আওতায় করা। আরও ১৩ শতাংশ আবেদন এসেছে কোনো পর্তুগিজ নাগরিককে বিয়ে বা তার সঙ্গে স্বীকৃত সহবাসের ভিত্তিতে।

এ ছাড়া প্রায় ১১ শতাংশ আবেদন বিদেশে জন্ম নেওয়া পর্তুগিজ নাগরিকদের নাতি-নাতনিদের এবং প্রায় ১০ শতাংশ আবেদন বিদেশে জন্ম নেওয়া পর্তুগিজ নাগরিকদের সন্তানদের পক্ষ থেকে করা হয়েছে।

এতে বোঝা যায়, বকেয়া আবেদনের বড় একটি অংশ সরাসরি অভিবাসীদের দীর্ঘদিন বসবাসের ভিত্তিতে করা naturalisation আবেদন নয়; বরং পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত ব্যক্তি, পরিবারভিত্তিক আবেদন এবং পুরোনো বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় করা আবেদনও এর মধ্যে রয়েছে।

নতুন জাতীয়তা আইন কার্যকরের ছয় সপ্তাহ পরের হিসাব

৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি বকেয়া আবেদনের এই হিসাব ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। অর্থাৎ পর্তুগালের সংশোধিত জাতীয়তা আইন কার্যকর হওয়ার মাত্র প্রায় ছয় সপ্তাহ পরের পরিস্থিতি এতে প্রতিফলিত হয়েছে।

নতুন জাতীয়তা আইন ১৯ মে ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই তারিখের আগে যেসব আবেদন জমা পড়ে ইতিমধ্যে প্রক্রিয়াধীন ছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে আগের আইনই প্রযোজ্য থাকবে। নতুন নিয়ম শুধু ১৯ মে বা তার পরে জমা দেওয়া নতুন আবেদনের ক্ষেত্রে কার্যকর।

পাঁচ বছরের বদলে সাত বা দশ বছর

নতুন আইনে নাগরিকত্বের জন্য বৈধভাবে বসবাসের ন্যূনতম সময় বাড়ানো হয়েছে।

আগের ব্যবস্থায় সাধারণভাবে পাঁচ বছর বৈধভাবে বসবাসের পর নাগরিকত্বের আবেদন করার সুযোগ ছিল।

এখন পর্তুগিজ ভাষাভাষী দেশগুলোর নাগরিক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশের নাগরিকদের নাগরিকত্ব আবেদনের জন্য অন্তত সাত বছর বৈধভাবে পর্তুগালে বসবাস করতে হবে। অন্য দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা করা হয়েছে ১০ বছর।

বাংলাদেশ পর্তুগিজ ভাষাভাষী দেশ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়। ফলে নতুন আইনের অধীনে ১৯ মে ২০২৬-এর পর নতুন করে আবেদনযোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের জন্য সাধারণভাবে ১০ বছরের বৈধ বসবাসের শর্ত প্রাসঙ্গিক হবে, অন্যান্য আইনি শর্তও পূরণ করতে হবে।

পুরোনো আবেদনকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

যাঁরা নতুন আইন কার্যকরের আগেই নাগরিকত্বের আবেদন জমা দিয়েছেন, তাঁদের জন্য নতুন সাত বা দশ বছরের residence rule পেছন থেকে কার্যকর হবে না।

পর্তুগালের সরকারি গেজেটে প্রকাশিত আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নতুন আইন কার্যকরের সময় যেসব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আগে থেকেই চলমান ছিল, সেগুলোতে পুরোনো জাতীয়তা আইনের বিধানই প্রযোজ্য হবে।

ফলে দীর্ঘদিন ধরে IRN-এ আবেদন ঝুলে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে শুধু নতুন আইন কার্যকর হয়েছে বলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন residence period আরোপ হবে না।

শুধু বসবাসের সময় নয়, বেড়েছে আরও শর্ত

সংশোধিত আইনে কেবল বৈধ বসবাসের সময় বাড়ানো হয়নি, naturalisation-এর জন্য আরও কয়েকটি শর্তও যুক্ত বা কঠোর করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে পর্তুগালের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জাতীয় প্রতীক সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান; নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও দায়িত্ব এবং দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিষয়ে জ্ঞান; গণতান্ত্রিক আইনের শাসনের মৌলিক নীতির প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা এবং নিজের জীবিকা নির্বাহের সক্ষমতা।

নির্দিষ্ট গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত হওয়া এবং জাতিসংঘ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিধিনিষেধের আওতায় থাকার বিষয়েও নতুন বিধানে শর্ত রাখা হয়েছে।

পর্তুগিজ বংশোদ্ভূতদের জন্য আবার সুযোগও বাড়ানো হয়েছে

আইন কঠোর হওয়ার পাশাপাশি পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত কিছু ব্যক্তির জন্য নাগরিকত্বের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

নতুন আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে পর্তুগালের মূল নাগরিকদের প্রপৌত্র বা great-grandchildren-দেরও নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আইনে তৃতীয় ডিগ্রির সরাসরি বংশধরদের জন্য বিশেষ naturalisation-এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে পর্তুগিজ সেফার্ডিক ইহুদিদের বংশধরদের জন্য যে বিশেষ নাগরিকত্ব ব্যবস্থা ছিল, সেটি নতুন আইনে বাতিল করা হয়েছে।

তবে আগেই জমা পড়া বিপুলসংখ্যক সেফার্ডিক বংশধরের আবেদন এখনো IRN-এর বকেয়া তালিকায় রয়েছে। এ কারণেই বর্তমান বকেয়া আবেদনের প্রায় ২৩ শতাংশ এই শ্রেণির বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাগরিকত্ব দেওয়ার সংখ্যাও কমেছে

বকেয়া আবেদন বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশিদের পর্তুগিজ নাগরিকত্ব পাওয়ার সংখ্যা কমেছে।

পুবলিকোর প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পর্তুগালে বসবাসরত বিদেশিদের মধ্যে নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিছু সরকারি পরিসংখ্যানে ২০২৫ সালে ১২ হাজার ৮২৯ জন বিদেশি বাসিন্দার নাগরিকত্ব পাওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে, আগের বছরে যা ছিল ২০ হাজার ৬২৪।

বিচার মন্ত্রণালয় বলেছে, নাগরিকত্ব ‘acquisition’-এর মাধ্যমে দেওয়ার সংখ্যা কমার একটি কারণ হলো পর্তুগিজ বংশোদ্ভূতদের ‘attribution’ আবেদনকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া।

বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং বিদেশে থাকা পর্তুগিজ বংশোদ্ভূতদের কনস্যুলেট ও অনলাইন মাধ্যমে জমা দেওয়া আবেদন অগ্রাধিকার দিয়ে প্রক্রিয়া করছে IRN। কারণ এসব ক্ষেত্রে নাগরিকত্বকে জন্মসূত্রে বিদ্যমান অধিকারের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

IRN-এর বিলম্ব নিয়ে সমালোচনা

বিপুলসংখ্যক আবেদন জমে থাকায় IRN-এর কাজের গতি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।

পর্তুগালের Sindicato dos Trabalhadores dos Registos e do Notariado—রেজিস্ট্রি ও নোটারি কর্মীদের ইউনিয়ন—দীর্ঘদিন ধরে জনবল ঘাটতি এবং আবেদন জমে থাকার বিষয়ে সতর্ক করে আসছে।

ইউনিয়নের দাবি, শুধু অস্থায়ী recovery team গঠন করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নতুন কর্মী নিয়োগ এবং রেজিস্ট্রি অফিসগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

আগস্টে ইউনিয়ন দাবি করেছিল, মে থেকে জুনের মধ্যে কিছু রেজিস্ট্রি সেবায় বকেয়া কাজ প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। তাদের হিসাবে IRN ব্যবস্থায় ২৭০ জন conservator এবং ২ হাজার ৭৩১ জন registration officer-এর ঘাটতি রয়েছে।

বকেয়া কমাতে আলাদা দল

অন্যদিকে বিচার মন্ত্রণালয় ও IRN বলছে, বকেয়া কাজ কমাতে recovery plan চালু করা হয়েছে।

জাতীয়তা সংক্রান্ত আবেদন নিষ্পত্তির জন্য আলাদা করে ৪১ জনের দল গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ জন লিসবনের Conservatória dos Registos Centrais এবং ১৩ জন পোর্তোর Arquivo Central-এ কাজ করছেন।

সরকারের আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, এই বিশেষ দল ইতিমধ্যে ১ হাজার ২৪০টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছে, পর্তুগিজ নাগরিকদের সন্তানদের ৬২৩টি আবেদন সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তুত করেছে এবং residence-based citizenship আবেদনের কয়েক হাজার খসড়া সিদ্ধান্ত তৈরি করেছে।

তবে ৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি আবেদন বকেয়া থাকার তুলনায় এই অগ্রগতি এখনো সীমিত।

আবেদনকারীরা যেভাবে অবস্থা জানতে পারবেন

যাঁদের পর্তুগিজ নাগরিকত্বের আবেদন ইতিমধ্যে IRN-এ রয়েছে, তাঁরা অনলাইনে আবেদনটির অবস্থা দেখতে পারেন।

IRN বর্তমানে প্রক্রিয়াকে চারটি প্রধান অবস্থায় দেখায়—Submitted, Under Analysis, For Decision এবং Completed।

আবেদন নিবন্ধিত হওয়ার পর দেওয়া access code ব্যবহার করে অনলাইনে বিনা খরচে আবেদনটির বর্তমান অবস্থা দেখা যায়।

পর্তুগালের ভেতরে নির্দিষ্ট Balcão da Nacionalidade, লিসবনের Conservatória dos Registos Centrais, পোর্তোর Arquivo Centralসহ বিভিন্ন রেজিস্ট্রি অফিসেও নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত সেবা পাওয়া যায়। বিদেশে বসবাসকারীরা পর্তুগিজ কনস্যুলেটের মাধ্যমেও নির্দিষ্ট ধরনের আবেদন করতে পারেন।

৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি আবেদন জমে থাকার এই পরিসংখ্যান এমন সময়ে সামনে এল, যখন পর্তুগালে নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম একদিকে কঠোর হয়েছে, অন্যদিকে পর্তুগিজ বংশোদ্ভূতদের কিছু শ্রেণির জন্য সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে। এখন IRN-এর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুরোনো আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার পাশাপাশি নতুন আইনের অধীনে আসা আবেদনগুলোও সময়মতো প্রক্রিয়া করা।