শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ করছেন ফ্রান্সের স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন থামার কোনো লক্ষণ না থাকায় এবার সরাসরি শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) এলিসি প্রাসাদে প্রায় ২০ জন হাইস্কুল শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ম্যাক্রোঁর সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের ‘দাবি ও উদ্বেগ’ শোনার জন্যই এ বৈঠক ডাকা হয়। বৈঠক শেষে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম Parcoursup-এ বড় ধরনের সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছেন ম্যাক্রোঁ। তবে তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার আবারও বিক্ষোভ
ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠকের পরও শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে। গত সপ্তাহের আন্দোলনের সময় সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে সরকার।
ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হবে। গত সপ্তাহের তুলনায় এটি প্রায় ১০ হাজার বেশি। বিভিন্ন স্থানে এলিট ইউনিট, ঘোড়সওয়ার পুলিশ, ড্রোন, হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান ও জলকামান প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
ম্যাক্রোঁ নিজেও শুক্রবার সকালে ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিরক্ষা পরিষদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। পরে তিনি শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সন্ধ্যায় প্যারিসে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন।
কোথাও নিষেধাজ্ঞা, কোথাও বদলেছে মিছিলের পথ
শনিবারের বিক্ষোভ সামনে রেখে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে সমাবেশ ও মিছিলের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
প্যারিসে কিছু মিছিলের অনুমোদিত পথ পরিবর্তন করা হয়েছে। কয়েকটি ছাত্র ও অন্যান্য সংগঠনের কর্মসূচি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। লিয়ঁ, রেনসহ বিভিন্ন শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মার্সেইয়ে অবশ্য ট্রেড ইউনিয়নের ডাকা মিছিলের জন্য একটি সীমিত পথ অনুমোদন করা হয়েছে।
গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে সংঘর্ষ ও ব্যাপক ভাঙচুরের পর সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ওই দিনের ঘটনাকে ঘিরে সরকার আগাম গোয়েন্দা তথ্য ও নিরাপত্তা প্রস্তুতির ঘাটতির সমালোচনার মুখেও পড়ে।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ কেন
ফ্রান্সে হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয় সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে। তাঁদের প্রধান অভিযোগ—অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, নিয়মিত ক্লাস বাতিল হচ্ছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি এবং বহু স্কুল ভবনের অবস্থা খারাপ।
লে মঁদের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০৭ সালের পর থেকে ফ্রান্সের মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার, অথচ একই সময়ে শিক্ষক পদ কমেছে ১১ হাজারের বেশি। এর ফলে সরকারি হাইস্কুলগুলোতে শ্রেণিকক্ষের ওপর চাপ বেড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির Parcoursup ব্যবস্থাও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের বড় কারণ। অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, বর্তমান পদ্ধতি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর একটি অংশ Parcoursup বাতিলের দাবি তুলেছে। তবে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ফিলিপ বাতিস্ত সেটি পুরোপুরি বাতিল করার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। সরকার অবশ্য বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা বলেছে।
৩ হাজার অতিরিক্ত শিক্ষক দেওয়ার ঘোষণা
বিক্ষোভের মুখে এরই মধ্যে ৩ হাজার অতিরিক্ত বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ বা মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সবচেয়ে বেশি শিক্ষকসংকটে থাকা স্কুলগুলোতে তাঁদের পাঠানোর কথা রয়েছে।
এই ঘোষণাকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ইউনিয়নগুলো আন্দোলনের প্রথম অর্জন হিসেবে দেখলেও তারা বলছে, সমস্যার তুলনায় ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহেও বহু স্কুল বন্ধ ছিল এবং দেশজুড়ে দশ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।
শিক্ষার্থী ও ইউনিয়নগুলোর বড় একটি অংশ শিক্ষাখাতে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ, স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও আসন তৈরির দাবি জানিয়েছে।
‘আমাদের কথা শোনা হোক’
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শুধু স্কুলের অবকাঠামো বা শিক্ষকের সংখ্যা নয়, রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষও সামনে আসছে।
শিক্ষার্থী নেতা নাথানায়েল কমবারি বলেছেন, সংকটটি মূলত সরকার ও তরুণদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার বিষয়টিও সামনে এনেছে। তাঁদের দাবি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের কথা শোনা এবং প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া হোক।
বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরাও বলেছেন, তাঁরা শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তব পরিবর্তন চান।
সরকারের সামনে অর্থনৈতিক চাপ
শিক্ষার্থীদের বড় অঙ্কের বরাদ্দের দাবি এমন সময়ে এসেছে, যখন ফ্রান্সের সরকার ২০২৭ সালের বাজেট ও ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ নিয়ে চাপের মধ্যে রয়েছে।
এ কারণে সরকার শিক্ষা ও জনসেবায় বড় আকারের নতুন ব্যয় করতে গেলে বাজেট ঘাটতির চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সংসদে সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বড় সংস্কার পাস করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই বাস্তবতায় সরকার একদিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার পথ খুলছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সোমবার শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ট্রেড ইউনিয়ন, নিয়োগকর্তা, স্থানীয় সরকার ও সংসদ সদস্যদের নিয়ে আরও একটি বৈঠক করবেন। সেখানে শিক্ষকসংকট, Parcoursup এবং শিক্ষার্থীদের অন্যান্য দাবির বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠকের পরও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় ফ্রান্সের কয়েক সপ্তাহের এই বিক্ষোভ এখনো শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
