‘তেলাপোকা’দের ঠেকাতে কার্যত অবরুদ্ধ দিল্লি, রাজপথে নামবে ‘যন্তর মন্তর ২.০’

delhi-cjp-jantar-mantar-protest

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ডাকা ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচি ঠেকাতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শনিবারের এই বিক্ষোভ ঘিরে মধ্য দিল্লির বড় অংশে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে, বন্ধ রাখা হয়েছে বহু মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ। বাতিল হয়েছে দিল্লিমুখী বহু ট্রেন। যন্তর মন্তর ঘিরে কয়েক কিলোমিটার এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) শনিবার সকাল ১০টায় যন্তর মন্তরে সমবেত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ তাদের প্রধান দাবি। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে বেশ কিছুদিন ধরেই আন্দোলন করছে সংগঠনটি। তবে নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

দিল্লিজুড়ে কড়া নিরাপত্তা

বিক্ষোভের আগের রাত থেকেই যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় বহুস্তরীয় ব্যারিকেড বসিয়েছে দিল্লি পুলিশ। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার রাত থেকে দিল্লির ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে শনিবার সকালে প্রকাশিত যাত্রী নির্দেশনায় অন্তত ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট বন্ধ থাকার কথা জানানো হয়েছে।

নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলস্টেশনমুখী বহু ট্রেনও বাতিল বা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। NDTV জানিয়েছে, শনিবার ভোর ৪টা থেকে বেলা ২টার মধ্যে ওই দুই স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল—এমন দূরপাল্লা ও স্থানীয় মিলিয়ে ২৫০টির বেশি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।

যন্তর মন্তরের আশপাশে প্রায় চার কিলোমিটার এলাকায় শুক্রবার রাত থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিতের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের অসন্তোষ

আন্দোলন ঠেকাতে নেওয়া ব্যাপক পরিবহন বিধিনিষেধ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।

শুক্রবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ সরকারের পদক্ষেপের আনুপাতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, ছোট একটি সমস্যার মোকাবিলায় অতিরিক্ত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে মেট্রো ও রেল পরিষেবায় এমন বিধিনিষেধ না দিতে বলা হয়, যাতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচল বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়ে।

দিল্লিতে ধ্রুব রাঠি

‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচির আগেই দিল্লিতে পৌঁছেছেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি দিল্লিতে নেওয়া ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পরিবহন বিধিনিষেধ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

এর আগে ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে সিজেপির বিক্ষোভে অংশ নেন ধ্রুব রাঠি ও অভিনেতা প্রকাশ রাজ। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেও উপস্থিত ছিলেন।

সেখানে প্রকাশ রাজ তাঁর স্বভাবসুলভ চলচ্চিত্রের সংলাপের ঢঙে জ্ঞানেশ কুমারকে উদ্দেশ করে বক্তব্য দেন। অন্যদিকে রাঠি নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করেন।

১০ হাজার মানুষকে আটকের দাবি

‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচির আগে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তাদের কর্মী-সমর্থক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যদের আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সিজেপি।

সংগঠনের মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কার দাবি, দেশজুড়ে অন্তত ১০ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

২৩ হাজারের বেশি আধা সামরিক সদস্য

পরিস্থিতি সামাল দিতে দিল্লিতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ২৩ হাজার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ সদস্য মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে সিআরপিএফ, এসএসবি, র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স, আইটিবিপি ও সিআইএসএফের সদস্য রয়েছেন। নারী আধা সামরিক বাহিনীর পাঁচটি কোম্পানিও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে সদস্যদের সর্বোচ্চ সংযম দেখাতে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ না করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

আটক রাখার ব্যবস্থাও প্রস্তুত

বড় সংখ্যায় বিক্ষোভকারী আটক হলে তাঁদের রাখার জন্য দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী আটককেন্দ্র প্রস্তুত রাখার খবর পাওয়া গেছে। একাধিক প্রতিবেদনে ১০টির বেশি এমন কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার কথা বলা হয়েছে।

দিল্লি পুলিশ অবশ্য ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি। পুলিশের বক্তব্য, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন না করা এবং আগের কর্মসূচিতে দেওয়া শর্ত ভঙ্গসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেই অনুমতি দেওয়া হয়নি। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছে পুলিশ।

অন্যদিকে সিজেপি নেতৃত্ব বলছে, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করা তাদের সাংবিধানিক অধিকার এবং অনুমতি না পেলেও তারা কর্মসূচি থেকে সরে আসবে না।

প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেও শুক্রবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বাধা কিংবা গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় তাঁরা ‘যন্তর মন্তর ২.০’ বাতিল করবেন না। শনিবার সকালে দিল্লিতে ইতিমধ্যে কিছু বিক্ষোভকারীকে আটক করার খবরও পাওয়া গেছে।

ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ব্যাপক নিরাপত্তাবেষ্টনী পেরিয়ে সিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে পারবেন কি না এবং ধ্রুব রাঠি ও অভিজিৎ দিপকের মতো পরিচিত মুখদের দিল্লির রাজপথে কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেওয়া হবে কি না।