বাংলাদেশ–আফগানিস্তান টেস্ট: পরিসংখ্যান, শক্তি-দুর্বলতায় কে কোথায় এগিয়ে

bangladesh vs afghanistan test 2026

মাত্র দুইবার টেস্ট ক্রিকেটে মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান। ফলটাও সমানে সমান—একটি জয় বাংলাদেশের, একটি আফগানিস্তানের। তবে দুই ম্যাচের ফলের ব্যবধানই বলে দেয়, এই লড়াইয়ে কোনো দলকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ২০১৯ সালে বাংলাদেশকে তাদের মাটিতে ২২৪ রানে হারিয়েছিল আফগানিস্তান। চার বছর পর মিরপুরে তার জবাব বাংলাদেশ দেয় ৫৪৬ রানের বিশাল জয়ে।

এবার সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার তৃতীয় অধ্যায়। ৯ থেকে ১৩ অক্টোবর আবুধাবির জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ। আফগানিস্তান স্বাগতিক দল হলেও ম্যাচটি হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

কাগজে-কলমে অভিজ্ঞতা, ব্যাটিংয়ের গভীরতা ও স্পিন আক্রমণে বাংলাদেশ কিছুটা এগিয়ে। তবে আবুধাবির ধীরগতির উইকেট এবং কন্ডিশনের সঙ্গে আফগানদের পরিচিতি ম্যাচটিকে কঠিন করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশ–আফগানিস্তান টেস্টে মুখোমুখি পরিসংখ্যান

পরিসংখ্যানবাংলাদেশআফগানিস্তান
মোট ম্যাচ২২
জয়১১
হার১১
ড্র০০
জয়ের হার৫০%৫০%

ICC-এর হেড-টু-হেড তথ্যে বাংলাদেশের বিপক্ষে আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক রহমত শাহ। দুই ম্যাচে তাঁর রান ১৪১, গড় ৭০.৫০। বাংলাদেশের বর্তমান স্কোয়াডের ব্যাটারদের মধ্যে আফগানিস্তানের বিপক্ষে মুশফিকুর রহিম করেছেন ৭৮ রান। বোলিংয়ে বাংলাদেশের তাইজুল ইসলাম নিয়েছেন ৮ উইকেট।

প্রথম দেখায় বাংলাদেশকে চমকে দিয়েছিল আফগানিস্তান

২০১৯ সালে চট্টগ্রামে প্রথম টেস্ট সাক্ষাৎটা বাংলাদেশের জন্য সুখকর ছিল না। প্রথম ইনিংসে ১০২ রান করে আফগানিস্তানের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান হয়েছিলেন রহমত শাহ। অধিনায়ক রশিদ খান ব্যাটে-বলে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন।

সে ম্যাচে দুই ইনিংস মিলিয়ে ১১ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাট হাতে ৭৫ রান করেছিলেন রশিদ। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে ২২৪ রানে হারিয়ে ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় আফগানিস্তান।

বাংলাদেশের ব্যাটিং তখন আফগান স্পিনের সামনে বড় পরীক্ষায় পড়েছিল। দুই ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ২০৫ ও ১৭৩ রান।

২০২৩ সালে বাংলাদেশের বড় জবাব

চার বছর পর মিরপুরে ছবিটা পুরোপুরি বদলে যায়। ২০২৩ সালের একমাত্র টেস্টে আফগানিস্তানকে ৫৪৬ রানে হারায় বাংলাদেশ। রানের ব্যবধানে সেটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় টেস্ট জয় এবং সে সময় টেস্ট ইতিহাসের তৃতীয় বৃহত্তম জয় ছিল।

প্রথম ইনিংসে নাজমুল হোসেন শান্ত করেন ১৪৬ রান। দ্বিতীয় ইনিংসেও তাঁর ব্যাট থেকে আসে ১২৪। মুমিনুল হক অপরাজিত ১২১ রান করেন। বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৩৮২ করার পর আফগানিস্তানকে ১৪৬ রানে গুটিয়ে দেয়। পরে ৪ উইকেটে ৪২৫ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ।

৬৬২ রানের অসম্ভব লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে আফগানিস্তান দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট হয়েছিল মাত্র ১১৫ রানে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি—অভিজ্ঞ ব্যাটিং

আবুধাবি টেস্টের জন্য বাংলাদেশের ব্যাটিং বিভাগে আছেন মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। তাঁদের সঙ্গে আছেন তানজিদ হাসান, শাদমান ইসলাম, সৌম্য সরকার, তাওহীদ হৃদয় ও জাকের আলী।

সাম্প্রতিক টেস্ট ফর্মও বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর মতো। আগস্টে অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম টেস্টে নয় উইকেটের ঐতিহাসিক জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় টেস্ট হারলেও দুই ম্যাচের সিরিজ শেষ হয়েছিল ১–১ সমতায়। ডারউইনের জয়ে তানজিদ হাসানের শতক এবং মেহেদী হাসান মিরাজের পাঁচ উইকেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

মিরাজ–তাইজুল হতে পারেন বাংলাদেশের বড় অস্ত্র

আবুধাবিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হতে পারে স্পিন আক্রমণ। মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলামের হাতে থাকবে মূল দায়িত্ব।

বাংলাদেশের বিপক্ষে আগের দুই টেস্টে ৮ উইকেট নিয়ে হেড-টু-হেডে বর্তমান দুই দলের বোলারদের মধ্যে এগিয়ে তাইজুল।

জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামের উইকেট কিছুটা ধীরগতির হতে পারে বলে বাংলাদেশের প্রধান কোচ ফিল সিমন্সও জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ম্যাচে স্পিনারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

পেস আক্রমণেও এখন বাংলাদেশের বিকল্প বেশি

বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলোর একটি পেস বোলিং। আফগানিস্তানের বিপক্ষে স্কোয়াডে রয়েছেন হাসান মাহমুদ, শরিফুল ইসলাম, এবাদত হোসেন ও খালেদ আহমেদ।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের পেসাররাই স্বাগতিক ব্যাটিংকে বড় চাপে ফেলেছিলেন। দুই ওপেনারকে ফিরিয়েছিলেন হাসান মাহমুদ। ফলে শুধু স্পিনের ওপর নির্ভর না করে কন্ডিশন অনুযায়ী পেস ও স্পিনের সমন্বয় করার সুযোগ আছে বাংলাদেশের।

আফগানিস্তানের বড় শক্তি রহমত শাহ

আফগানিস্তানের ব্যাটিংয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম রহমত শাহ। বাংলাদেশের বিপক্ষে তাঁর রেকর্ডও ভালো—২ টেস্টে ১৪১ রান, গড় ৭০.৫০। ২০১৯ সালে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিপক্ষেই করেছিলেন ১০২ রান।

এবার তাঁর দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টসহ আসন্ন লাল বলের ম্যাচগুলোতে আফগানিস্তানকে নেতৃত্ব দেবেন রহমত। দলে অভিজ্ঞ হাশমতউল্লাহ শহীদিও আছেন।

আফগানিস্তানের বড় ঘাটতি—নেই রশিদ খান

২০১৯ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে আফগানিস্তানের জয়ের মূল নায়ক ছিলেন রশিদ খান। কিন্তু এবারের টেস্টে তাঁকে পাচ্ছে না আফগানিস্তান।

আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রশিদ খান ও ইব্রাহিম জাদরানকে বাংলাদেশের বিপক্ষে এই টেস্টসহ আসন্ন তিনটি টেস্ট থেকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে। icc

রশিদের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বড় স্বস্তি হতে পারে। তাঁর জায়গায় আফগানিস্তানের স্পিন আক্রমণে কাইস আহমদ, জিয়া উর রহমান আকবর ও খলিল গুরবাজদের ওপর দায়িত্ব বাড়বে।

আবুধাবির উইকেটে আগে ব্যাটিং গুরুত্বপূর্ণ?

জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামের অতীত টেস্ট পরিসংখ্যানও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে আগের ১৫ টেস্টের মধ্যে প্রথমে ব্যাট করা দল জিতেছে ৯টি, আর রান তাড়া করে জয় এসেছে মাত্র ২টিতে।

ইনিংসগড় স্কোর
প্রথম ইনিংস৩৬০
দ্বিতীয় ইনিংস৩৪১
তৃতীয় ইনিংস২৭৪
চতুর্থ ইনিংস১৩৬

চতুর্থ ইনিংসের গড় মাত্র ১৩৬। ফলে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘ সময় খেলা চলার সঙ্গে উইকেট ধীর হয়ে স্পিনারদের সহায়তা বাড়লে শেষ ইনিংসে ব্যাটিং আরও কঠিন হতে পারে। স্টেডিয়ামটিতে সর্বোচ্চ সফল রান তাড়ার স্কোরও মাত্র ১০৮। Cricbuzz

বাংলাদেশের জন্য চিন্তার জায়গা কোথায়

বাংলাদেশের প্রধান উদ্বেগ হতে পারে আবুধাবির গরম এবং কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। এশিয়ান গেমস থেকে আসা লিটন দাস, নাজমুল হোসেন শান্ত, তাওহীদ হৃদয়, শরিফুল ইসলাম, হাসান মাহমুদ ও তানজিদ হাসান তুলনামূলক কম সময় পেয়েছেন UAE কন্ডিশনে প্রস্তুতির জন্য।

প্রধান কোচ ফিল সিমন্সও ম্যাচের আগে এই বিষয়টিকে বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। BSS

আরেকটি পরীক্ষা হবে ধীরগতির উইকেটে আফগানিস্তানের রিস্ট স্পিন সামলানো। ২০১৯ সালে স্পিনের বিপক্ষেই বাংলাদেশের ব্যাটিং ধসে পড়েছিল। যদিও বর্তমান দলে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর মতো মুশফিক, মুমিনুল, শান্ত ও লিটনের মতো ব্যাটার আছেন।

শক্তি–দুর্বলতায় কে কোথায়

বিভাগবাংলাদেশআফগানিস্তান
টেস্ট অভিজ্ঞতাএগিয়েতুলনামূলক কম
ব্যাটিং গভীরতাশক্তিশালীরহমত–হাশমতউল্লাহর ওপর নির্ভরতা বেশি
স্পিনমিরাজ–তাইজুল বড় শক্তিকাইসসহ বেশ কয়েকজন স্পিনার
পেস আক্রমণবিকল্প বেশিতুলনামূলক কম অভিজ্ঞ
UAE কন্ডিশনমানিয়ে নেওয়ার পরীক্ষাপরিচিত কন্ডিশন
সাম্প্রতিক টেস্ট ফর্মঅস্ট্রেলিয়ায় ঐতিহাসিক জয়ভারতের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্টে বড় হার
বড় অনুপস্থিতি—রশিদ খান, ইব্রাহিম জাদরান

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক টেস্ট পারফরম্যান্স, অভিজ্ঞতা ও বোলিং বৈচিত্র্যে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও আফগানিস্তানের জন্য আবুধাবির ধীরগতির কন্ডিশন বড় সহায়তা হতে পারে। বিশেষ করে প্রথম ইনিংসে বড় সংগ্রহ গড়তে না পারলে ম্যাচের পরের দিকে স্পিনের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটারদের পরীক্ষা আরও কঠিন হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

বাংলাদেশ–আফগানিস্তান টেস্ট কখন

ম্যাচ: আফগানিস্তান বনাম বাংলাদেশ, একমাত্র টেস্ট
তারিখ: ৯–১৩ অক্টোবর ২০২৬
ভেন্যু: জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আবুধাবি
আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সূচি অনুযায়ী শুরু: স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৩০ মিনিট, অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় সকাল ১১টা ৩০ মিনিট।
বাংলাদেশে টিভি: টি স্পোর্টস ম্যাচটি সরাসরি সম্প্রচারের কথা জানিয়েছে বলে BSS জানিয়েছে। BSS

বাংলাদেশের স্কোয়াড

নাজমুল হোসেন শান্ত (অধিনায়ক), তানজিদ হাসান, শাদমান ইসলাম, সৌম্য সরকার, মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস, তাওহীদ হৃদয়, জাকের আলী, মেহেদী হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম, হাসান মাহমুদ, খালেদ আহমেদ, এবাদত হোসেন ও শরিফুল ইসলাম।