অভিবাসন মামলায় মানবাধিকার কনভেনশনের নতুন ব্যাখ্যায় সম্মত ৪৬ দেশ

europe-migration-policy-return-hub

ইউরোপ ও এর বাইরের ৪৬টি দেশ অভিবাসন-সংক্রান্ত মামলায় ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের একটি নতুন ব্যাখ্যায় সম্মত হয়েছে। নতুন এই রাজনৈতিক ঘোষণায় তৃতীয় দেশে স্থাপিত বিতর্কিত ‘রিটার্ন হাব’ বা প্রত্যাবাসন কেন্দ্র ব্যবহারের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকানো এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য সদস্যদেশগুলোর পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানের পর এই ঘোষণা দেওয়া হলো। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই উদ্যোগ ইউরোপে অভিবাসীদের মানবাধিকার সুরক্ষাকে দুর্বল করতে পারে।

কাউন্সিল অব ইউরোপ শুক্রবার মলদোভার রাজধানী কিশিনাউতে ৪৬ সদস্যরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অ-বাধ্যতামূলক ঘোষণাটি গ্রহণ করে। পরে এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ ও বসবাস নিয়ন্ত্রণ করা রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম অধিকার। তবে তা ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করতে হবে।

ঘোষণায় বলা হয়েছে, যেসব দেশ বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর আগমনের মুখে পড়ছে, তারা অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে। এসব পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে তৃতীয় দেশে ‘রিটার্ন হাব’ স্থাপন এবং ট্রানজিট দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করা।

কাউন্সিল অব ইউরোপ ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের তত্ত্বাবধান করে। এই আদালত ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের সুরক্ষা নিশ্চিত করে থাকে। তাই অভিবাসন নীতির নতুন ব্যাখ্যা আদালতের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

ব্রাসেলসভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন পিআইসিইউএমের মুখপাত্র কিয়ারা কাতেলি বলেন, এই ঘোষণা আদালত ও কনভেনশন—দুটিকেই দুর্বল করতে পারে। তাঁর মতে, সরকারগুলো প্রত্যাবাসন সহজ করার জন্য একটি স্বাধীন আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত মানবাধিকার সুরক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কিয়ারা আরও বলেন, এমন ব্যক্তিদেরও প্রত্যাবাসনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যাঁরা নিজ দেশে নির্যাতন, অমানবিক বা অপমানজনক আচরণের মুখোমুখি হতে পারেন। এমনকি যাঁদের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রয়োজন, তাঁরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান অফিসের পরিচালক ইভ গেডি বলেন, অভিবাসন অবস্থার ভিত্তিতে দুই স্তরের মানবাধিকার ব্যবস্থা তৈরি করা মানবাধিকারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। তাঁর ভাষায়, মানবাধিকার সর্বজনীন।

গত বছর ইতালি আলবেনিয়ায় স্থাপিত একটি ‘রিটার্ন হাব’-এ কয়েকজন অনিয়মিত অভিবাসীকে পাঠায়। তাঁদের ইতালিতে থাকার অনুমতি ছিল না। এর মাধ্যমে ইতালি প্রথম ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশ হিসেবে প্রত্যাখ্যাত অভিবাসীদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের এমন একটি দেশে পাঠায়, যা তাঁদের নিজ দেশ নয় এবং তাঁদের যাত্রাপথের দেশও নয়।

মানবাধিকারকর্মীরা এ ধরনের নীতিকে অমানবিক বলে সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ এসব নীতির তুলনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবাসন নীতির সঙ্গে।

২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশে ডানপন্থি দল ক্ষমতায় আসার পর অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থান আরও জোরদার হয়েছে। গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নয়টি দেশ—অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, চেক রিপাবলিক, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ইতালি, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ডের নেতারা এক খোলা চিঠিতে দাবি করেন, মানবাধিকার কনভেনশন বিদেশি অপরাধীদের বহিষ্কারে বাধা তৈরি করছে।

ওই দেশগুলোর অভিযোগ, ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত কনভেনশনের এমন ব্যাখ্যা দিয়েছে, যা ‘ভুল লোকদের’ সুরক্ষা দিয়েছে এবং বিদেশি অপরাধীদের বহিষ্কারের ক্ষেত্রে একাধিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার এই ঘোষণাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এটি ইউরোপে ন্যায্য ও দৃঢ় অভিবাসন নীতির পথকে শক্তিশালী করবে। তিনি বলেন, অভিবাসন একটি সাধারণ চ্যালেঞ্জ, যার জন্য সাধারণ সমাধান প্রয়োজন।

ঘোষণা স্বাক্ষরের পর কাউন্সিল অব ইউরোপের মহাসচিব আলাইন বেরসেট বলেন, কিশিনাউ ঘোষণা কাউন্সিলের নিজস্ব কাজের পাশাপাশি জাতীয় কর্তৃপক্ষ ও দেশীয় আদালতের কাজেও নির্দেশনা দেবে।

আরকেসি/আরআর (এপি)