জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভাষণ দিতে মঞ্চে ওঠার পরপরই প্রতিবাদ জানিয়ে অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান বিভিন্ন দেশের কয়েক ডজন কূটনীতিক ও প্রতিনিধি। এ সময় কেউ কেউ দুয়োধ্বনি দেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর নিজস্ব প্রতিনিধিদল দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানায়।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এ ঘটনা ঘটে। নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরেও বিক্ষোভ করেন কয়েক শ মানুষ।
নেতানিয়াহু মঞ্চে উঠতেই আসন ছাড়েন প্রতিনিধিরা
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু বক্তব্য দেওয়ার জন্য মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা নিজেদের আসন ছেড়ে বেরিয়ে যেতে শুরু করেন।
এ সময় অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত কয়েকজন প্রতিনিধি দুয়োধ্বনি দেন। বিপরীতে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে নেতানিয়াহুকে স্বাগত জানান।
একই সময়ে অধিবেশন কক্ষে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হলে সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান বারবার প্রতিনিধিদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানের মধ্যেই একের পর এক প্রতিনিধিকে অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।
ওয়াকআউটের পর অধিবেশন কক্ষের অনেক আসন খালি হয়ে যায়। তবে ঠিক কতটি দেশের প্রতিনিধিদল সম্পূর্ণভাবে অধিবেশন বর্জন করেছে, তা এএফপির প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি।
ওয়াকআউট করা প্রতিনিধিদের উদ্দেশে নেতানিয়াহুর মন্তব্য
প্রতিনিধিদের অধিবেশন কক্ষ ত্যাগের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। যাঁরা ওয়াকআউট করেছেন, তাঁদের উদ্দেশে নেতানিয়াহু বলেন, নৈতিকভাবে কাপুরুষ অন্য কেউ কক্ষে থেকে থাকলে তাঁরাও যেন বেরিয়ে যান।
পরে নিজের ভাষণে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি কয়েকটি দেশের সরকারের সমালোচনাও করেন।
নেতানিয়াহুর বক্তব্যে ইরান, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও তুরস্কের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন এবং সমালোচকদের অবস্থানের বিরোধিতা করেন।
ওয়াকআউটের আহ্বান জানিয়েছিল ফিলিস্তিন
এএফপির হাতে আসা একটি আনুষ্ঠানিক স্মারক অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ভাষণের আগে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের কাছে যৌথভাবে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানিয়েছিল ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদল।
স্মারকে নেতানিয়াহুর বক্তব্য বর্জন এবং তিনি মঞ্চে ওঠার সময় অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। বৃহস্পতিবারের ওয়াকআউটের আগে থেকেই গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের অধিবেশনে বিভিন্ন দেশের নেতারা উদ্বেগ ও সমালোচনা প্রকাশ করে আসছিলেন।
জাতিসংঘের বাইরে বিক্ষোভ, কয়েকজন আটক
নেতানিয়াহুর ভাষণকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কাছে কয়েক শ বিক্ষোভকারী জড়ো হন। তাঁদের মধ্যে অনেকে সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।
বিক্ষোভকারীরা ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের দাবি জানান। গাজা ও ইরানের মানুষের জীবন রক্ষার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন তাঁরা।
বিক্ষোভের সময় কয়েকজনকে আটক করে নিউইয়র্ক পুলিশ। তবে ঠিক কতজনকে আটক করা হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতে গাজায় যুদ্ধ বন্ধের দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড ছিল। নেতানিয়াহুর সফর ও জাতিসংঘে তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করতেই এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়।
গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মধ্যে ভাষণ
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ফিলিস্তিনিদের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মধ্যেই জাতিসংঘে ভাষণ দেন নেতানিয়াহু।
জাতিসংঘের চলতি অধিবেশনে বিভিন্ন দেশের নেতারা গাজায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, মানবিক সহায়তা এবং ফিলিস্তিন সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে দেশটির সামরিক পদক্ষেপকে আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
ইসরায়েলের অবস্থান এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের প্রতিবাদের এই বিপরীত চিত্র বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
