পর্তুগালের AIMA-তে ঝুলে আছে ৮৯ হাজার মামলা, তিন বছরেও কাটেনি অভিবাসন জটিলতা

AIMA change Portugal Residence

প্রতিষ্ঠার তিন বছর পূর্ণ করলেও অভিবাসনসংক্রান্ত আবেদন ও মামলার জটিলতা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি পর্তুগালের অভিবাসন সংস্থা এজেন্সি ফর ইন্টিগ্রেশন, মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম (AIMA)। সংস্থাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৮৯ হাজার মামলা এখনো দেশটির প্রশাসনিক আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। একই সময়ে কর্মীসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪০ জনে।

পর্তুগালের সংবাদমাধ্যম ইকো (ECO) গত ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পুরোনো আবেদন নিষ্পত্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও নতুন আবেদন ও মামলার চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সংস্থাটি।

২০২৩ সালের অক্টোবরে পর্তুগালের সাবেক ফরেনার্স অ্যান্ড বর্ডার্স সার্ভিস (SEF) বিলুপ্তির পর AIMA প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিদেশি নাগরিকদের বসবাসের অনুমতি, অভিবাসনসংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং একীভূতকরণের দায়িত্ব পায় নতুন সংস্থাটি। তবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশি দায়িত্ব অন্য সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

আদালতে ঝুলে আছে ৮৯ হাজার মামলা

পর্তুগালের প্রশাসনিক ও কর আদালতের উচ্চ পরিষদ (CSTAF) জানিয়েছে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত AIMA-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৮৯ হাজার মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল।

এর আগে এপ্রিলে বিশেষ বিচারক দল কাজ শুরু করার সময় বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার। অর্থাৎ কয়েক মাসে ৩৬ হাজার মামলা কমেছে, যা মোট মামলার ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

তবে পুরোনো মামলার সংখ্যা কমলেও নতুন মামলা দায়ের অব্যাহত রয়েছে।

শুধু ১ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে লিসবনের প্রশাসনিক আদালতে AIMA-সংশ্লিষ্ট ৩ হাজার ৬৮৩টি নতুন মামলা জমা পড়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২০৪টি করে মামলা দায়ের হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিশেষ বিচারক দলের কার্যক্রম আগামী ৩০ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে CSTAF।

৯৮ শতাংশ পুরোনো আবেদন নিষ্পত্তির দাবি সরকারের

পর্তুগাল সরকার দাবি করেছে, AIMA-র পুরোনো আবেদন নিষ্পত্তির বিশেষ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

গত ৭ অক্টোবর দেশটির পার্লামেন্টে এক শুনানিতে প্রেসিডেন্সি মন্ত্রী আন্তোনিও লেইতাও আমারো জানান, বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় থাকা ৯ লাখ ৪০ হাজার নোটিফিকেশনের মধ্যে ৯৮ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়েছে।

এর মধ্যে সাবেক ‘এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট’ ব্যবস্থার আওতায় জমা পড়া প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার আবেদনও রয়েছে।

২০২৪ সালে এই আবেদনব্যবস্থা বাতিল করা হয়। মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলোর মধ্যে মাত্র ৫ হাজারের মতো এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বিশেষ কার্যক্রমে মোট ১ হাজার ৬১০ জনকে যুক্ত করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি অ্যাপয়েন্টমেন্ট সম্পন্ন হয়েছে এবং ৩ লাখের বেশি রেসিডেন্স পারমিট ইস্যু করা হয়েছে।

তবে প্রশাসনিক আবেদন নিষ্পত্তির এই হিসাব আদালতে বিচারাধীন ৮৯ হাজার মামলার হিসাব থেকে আলাদা।

কর্মী বাড়লেও কমেনি কাজের চাপ

প্রতিষ্ঠার সময় ২০২৩ সালে AIMA-তে কর্মরত ছিলেন ৭১৪ জন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪০ জনে।

অর্থাৎ তিন বছরে কর্মীসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ।

অন্যদিকে, একই সময়ে পর্তুগালে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ থেকে বেড়ে ১৬ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়লেও সেই তুলনায় কর্মীসংখ্যা বাড়েনি।

মাইগ্রেশন টেকনিশিয়ানদের সংগঠন ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন অব মাইগ্রেশন টেকনিশিয়ানস (STM) জানিয়েছে, কর্মীস্বল্পতা, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে নিয়মিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

এসব সমস্যার সমাধান, উন্নত কর্মপরিবেশ এবং অভিবাসন কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক পেশাগত কাঠামোর দাবিতে গত ৬ অক্টোবর দেশজুড়ে ধর্মঘট পালন করেন AIMA-র কর্মীরা।

সংস্থাটির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ওইদিন দুপুর পর্যন্ত ১১ দশমিক ৩১ শতাংশ কর্মী ধর্মঘটে অংশ নেন।

AIMA-র নেতৃত্বে পরিবর্তন

প্রতিষ্ঠার তৃতীয় বার্ষিকীর মধ্যেই AIMA-র শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের ঘোষণা এসেছে।

গত ৭ অক্টোবর মন্ত্রী আন্তোনিও লেইতাও আমারো জানান, পেদ্রো পর্তুগাল গাসপারের পরিবর্তে সংস্থাটির নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেবেন সিজার তেইশেইরা।

তিনি এর আগে AIMA-র পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন।

সরকারের পক্ষ থেকে আগের নেতৃত্বের কার্যক্রমকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করা হলেও অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় নতুন পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

তবে কর্মীদের সংগঠন STM মনে করে, শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সেবার মানোন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত জনবল, কার্যকর পরিকল্পনা ও উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

অনলাইন সেবা ও প্রযুক্তিতে গুরুত্ব

অভিবাসীদের সেবা সহজ করতে অনলাইন কার্যক্রম আরও উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছে AIMA।

এর মধ্যে আবেদনকারীদের অনলাইনে ফাইলের অগ্রগতি দেখার ব্যবস্থা এবং ইমেইল ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের উদ্যোগ রয়েছে।

সংস্থাটি ইমেইল শ্রেণিবিন্যাসের জন্য একটি এআইভিত্তিক প্রযুক্তি তৈরি করেছে। তবে আবেদনকারীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব এখনো সংশ্লিষ্ট কর্মীদের হাতেই থাকছে।

এ ছাড়া ফ্যামিলি রিইউনিফিকেশন বা পরিবারের সদস্যদের একত্র করার আবেদন বর্তমানে সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের একটি।

সাম্প্রতিক এক সপ্তাহে এই খাতে ৫ হাজারের বেশি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নির্ধারণ করেছে AIMA।

২০২৭ সালে বাজেট বাড়ছে প্রায় ৩৯ শতাংশ

পর্তুগালের প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের রাষ্ট্রীয় বাজেটে AIMA-র জন্য ১৩ কোটি ৫০ লাখ ইউরো বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

২০২৬ সালে সংস্থাটির বাজেট ছিল ৯ কোটি ৭৪ লাখ ইউরো। সে হিসাবে নতুন বাজেট প্রস্তাবে বরাদ্দ বাড়ছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

বর্ধিত অর্থ মূলত অভিবাসন আবেদন নিষ্পত্তি, বসবাসের অনুমতিপত্র প্রদান ও নবায়ন, পরিবারের সদস্যদের পুনর্মিলন এবং প্রযুক্তিগত সেবার উন্নয়নে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

পর্তুগালে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের জন্য AIMA অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি সংস্থা। বিশেষ করে রেসিডেন্স কার্ড, নবায়ন ও পরিবারের সদস্যদের পর্তুগালে আনার আবেদন নিষ্পত্তিতে সংস্থাটির কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল বহু অভিবাসী।

তিন বছরে পুরোনো আবেদন নিষ্পত্তিতে অগ্রগতি হলেও আদালতে বিপুলসংখ্যক মামলা এবং নিয়মিত সেবার বিলম্ব কাটিয়ে ওঠাই এখন সংস্থাটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।