আজ থেকে পর্তুগালে প্রথম লবিং আইন কার্যকর: নতুন নিয়মে কী বদলাবে

portugal-lobbying-law-2026

পর্তুগালে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ লবিং আইন কার্যকর হয়েছে। আজ সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া এই আইনের লক্ষ্য সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো।

নতুন আইনের আওতায় কোনো প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ সরকারি নীতি, আইন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সেই কার্যক্রমের তথ্য নিবন্ধন করতে হবে।

আইনটির আনুষ্ঠানিক নাম Law No. 5-A/2026। এটি চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি পর্তুগালের সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশের ১৮০ দিন পর আইনটি কার্যকর হলো।

লবিং কার্যক্রম কী

নতুন আইনে লবিংকে বৈধ স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজের বা অন্য কারও স্বার্থে সরকারি নীতি, আইন, বিধিমালা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা সরকারি চুক্তিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে তা লবিং কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক, মতামত বা প্রস্তাব পাঠানো, গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন এবং নীতি প্রণয়নসংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নেওয়ার মতো কার্যক্রম এর আওতায় থাকবে।

তবে নতুন আইনে লবিং নিষিদ্ধ করা হয়নি। কোন প্রতিষ্ঠান কার স্বার্থে সরকারি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে, সেটি প্রকাশ করাই আইনের মূল উদ্দেশ্য।

চালু হচ্ছে স্বচ্ছতা নিবন্ধন

আইনের আওতায় রেজিস্তো দে ত্রান্সপারেন্সিয়া দা রিপ্রেজেন্তাসাও দে ইন্তেরেসেস, সংক্ষেপে আরটিআরআই, নামে একটি প্রকাশ্য স্বচ্ছতা নিবন্ধন চালু করা হবে।

পর্তুগালের পার্লামেন্ট এই নিবন্ধন পরিচালনা করবে। সাধারণ মানুষ বিনা মূল্যে নিবন্ধনের তথ্য দেখতে পারবেন।

যেসব প্রতিষ্ঠান পেশাগতভাবে নিজেদের বা অন্য কোনো পক্ষের স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব করবে, তাদের আরটিআরআইয়ে নিবন্ধন করতে হবে। সেখানে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, যোগাযোগের ঠিকানা, প্রতিনিধিত্ব করা স্বার্থ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গ্রাহকের তথ্য থাকতে পারে।

নিবন্ধনে দেওয়া তথ্যে পরিবর্তন এলে তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হালনাগাদ করতে হবে।

সরকারি বৈঠকের তথ্য প্রকাশ

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নিবন্ধিত স্বার্থ প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈঠকের তথ্য প্রকাশ করতে হবে।

বৈঠকের তারিখ, আলোচনার বিষয় এবং বৈঠকের উদ্দেশ্যের মতো তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। অন্তত তিন মাস পরপর এসব তথ্য হালনাগাদ করার বিধান রাখা হয়েছে।

এর ফলে কোনো কোম্পানি, ব্যবসায়ী সংগঠন বা অন্য কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ সরকারি নীতি নিয়ে কার সঙ্গে আলোচনা করেছে, তা সাধারণ মানুষ জানতে পারবেন।

আইন তৈরিতে কারা প্রভাব রেখেছে, জানা যাবে

নতুন আইনে একটি ‘লেজিসলেটিভ ফুটপ্রিন্ট’ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো আইন বা বিধিমালা তৈরির সময় কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, সেই তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।

আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ করা হতে পারে। এতে কোনো আইনের খসড়া তৈরির সময় বাইরের কোন কোন পক্ষ মতামত দিয়েছে বা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে, তা জানা সহজ হবে।

কারা আইনের আওতায়

পর্তুগালের কেন্দ্রীয় সরকার, পার্লামেন্ট, প্রেসিডেন্সি, সরকারি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে লবিং কার্যক্রম নতুন আইনের আওতায় থাকবে।

আজোরেস ও মাদেইরার আঞ্চলিক সরকারও এর অন্তর্ভুক্ত। বিদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পর্তুগালের সরকারি সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে তাদের ক্ষেত্রেও আইনটি প্রযোজ্য হতে পারে।

তবে সাধারণ নাগরিকের অভিযোগ, আবেদন বা মতামত দেওয়াকে লবিং হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। আইনজীবীদের কিছু পেশাগত কার্যক্রম এবং শ্রমিক ও নিয়োগকারী সংগঠনের সামাজিক সংলাপও আইনের আওতার বাইরে থাকতে পারে।

সাবেক কর্মকর্তাদের ওপর বিধিনিষেধ

স্বার্থের সংঘাত কমাতে সাবেক রাজনৈতিক পদধারী ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য তিন বছরের বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।

দায়িত্ব ছাড়ার পর তিন বছর পর্যন্ত তাঁরা যে মন্ত্রণালয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, সেই প্রতিষ্ঠানের কাছে অন্য কোনো পক্ষের হয়ে লবিং করতে পারবেন না।

বর্তমান রাজনৈতিক পদধারী ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারাও অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে লবিং কার্যক্রম চালাতে পারবেন না।

নিয়ম না মানলে ব্যবস্থা

নিবন্ধন ছাড়া পেশাগত লবিং করা, মিথ্যা তথ্য দেওয়া বা আইনের আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

শাস্তির মধ্যে নিবন্ধন সাময়িকভাবে স্থগিত, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করা এবং সরকারি পরামর্শ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করার বিধান রয়েছে।

গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি পর্তুগালের সরকারি কৌঁসুলির দপ্তরে পাঠানো হতে পারে।

নিবন্ধনের জন্য ৬০ দিন

আরটিআরআই নিবন্ধন ব্যবস্থা কবে পুরোপুরি চালু হবে, তা পর্তুগালের পার্লামেন্ট আলাদা নোটিশে জানাবে।

যেসব প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে পেশাগতভাবে অন্য পক্ষের স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব করছে, তাদের নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর পর ৬০ দিনের মধ্যে নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

নিবন্ধন ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হওয়ার আগপর্যন্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে বৈঠক ও শুনানির তথ্য নিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।

নতুন আইনকে পর্তুগালে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নিবন্ধনের তদারকি এবং আইনটির কার্যকর প্রয়োগ কতটা স্বাধীনভাবে করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

আইন কার্যকর হওয়ার তিন বছর পর এর ফলাফল মূল্যায়ন করা হবে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে আইনে পরিবর্তন আনতে পারবে পর্তুগালের পার্লামেন্ট।