অনলাইনে টিন সার্টিফিকেট বাতিল করা যায়? জানুন আবেদনের নিয়ম

tin certificate cancellation bangladesh

টিন সার্টিফিকেট বাতিলের নিয়ম নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে। কেউ চাকরি বা ব্যবসার প্রয়োজনে টিআইএন খুলেছেন, পরে সেটির প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আবার কেউ ভুল করে নিবন্ধন করেছেন। তবে প্রয়োজন নেই মনে হলেই অনলাইন থেকে টিআইএন মুছে দেওয়া যায় না। বাতিলের জন্য নির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে আবেদন করতে হয় এবং কর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলের উপকর কমিশনারের কাছে কারণ ব্যাখ্যা করে আবেদন করার কথা বলা হয়েছে। সম্পূর্ণ অনলাইনে করদাতা নিজেই টিআইএন বাতিল করতে পারবেন—এমন সুবিধা সরকারি সূত্রে নিশ্চিত করা যায়নি।

টিন সার্টিফিকেট বাতিল বলতে কী বোঝায়?

টিআইএন হলো করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর। প্রচলিতভাবে ‘টিন সার্টিফিকেট বাতিল’ বলা হলেও আইনে বিষয়টি করদাতার নিবন্ধন বাতিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬২ ধারা অনুযায়ী, নিবন্ধন বাতিলের অর্থ টিআইএন নিষ্ক্রিয় বা ব্যবহার অনুপযোগী করা। এতে আগে জমা দেওয়া তথ্য ও রেকর্ড মুছে যায় না। ফলে সার্টিফিকেটের পিডিএফ মুছে ফেলা কিংবা অনলাইন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার বন্ধ করা নিবন্ধন বাতিলের সমতুল্য নয়।

অনলাইনে টিন সার্টিফিকেট বাতিল করা যায় কি?

অনলাইনে টিআইএন নিবন্ধন এবং আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া পৃথক সেবা। এসব সুবিধা থাকলেই একই পোর্টাল থেকে নিবন্ধন বাতিল করা যাবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

এনবিআরের আয়করবিষয়ক প্রশ্নোত্তরে টিআইএন বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার বরাবর আবেদনের নির্দেশনা রয়েছে। তাই প্রথমে নিজের কর সার্কেলে যোগাযোগ করে আবেদন গ্রহণের বর্তমান পদ্ধতি জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

কোনো ওয়েবসাইটে ‘এক ক্লিকে টিন বাতিল’ করার নির্দেশনা দেখলে সেটি অনুসরণের আগে সরকারি সূত্রে মিলিয়ে নিন। কর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া শুধু অনলাইনে কোনো অনুরোধ পাঠানোকে বাতিলের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করবেন না।

কারা টিআইএন বাতিলের আবেদন করতে পারবেন?

আয়কর আইনের ২৬২ ধারায় নিবন্ধন বাতিলের কয়েকটি কারণ উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • নির্ধারিত শর্তে করদাতা হিসেবে নিবন্ধন বা রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজন না থাকা।
  • করদাতার মৃত্যু কিংবা প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন বা বিলুপ্তি।
  • স্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ত্যাগ করা এবং দেশে আয়মূলক কর্মকাণ্ড না থাকা।
  • ভুল বা একাধিক নিবন্ধন থাকা।
  • আইনি মর্যাদার পরিবর্তন অথবা অন্য আইনানুগ কারণ।

শুধু আয় কমে যাওয়া বা সাময়িকভাবে চাকরি না থাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধন বাতিলের অনুমোদন নয়। সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।

আবেদনের আগে কী যাচাই করবেন?

কর্তৃপক্ষ আবেদন বিবেচনার সময় বকেয়া করদায়, চলমান কর নির্ধারণ কার্যক্রম এবং নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা আয়করসংক্রান্ত বিরোধ আছে কি না, তা যাচাই করবে। পাশাপাশি বাতিলের কারণের সত্যতাও পরীক্ষা করবে।

এ কারণে আবেদনের আগে নিজের করনথি পর্যালোচনা করুন। আগের কোনো রিটার্ন জমা দেওয়া বাকি আছে কি না, কর পরিশোধের নোটিশ পেয়েছেন কি না কিংবা কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে কি না—সংশ্লিষ্ট সার্কেল থেকে জেনে নিন।

কী কী কাগজপত্র লাগতে পারে?

বাতিলের কারণ অনুযায়ী সহায়ক নথি আলাদা হতে পারে। প্রস্তুতির জন্য নিচের কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে রাখতে পারেন।

সম্ভাব্য নথিব্যবহারের উদ্দেশ্য
কারণ উল্লেখ করা আবেদনপত্রকেন নিবন্ধন বাতিল প্রয়োজন, তা ব্যাখ্যা করা
টিআইএন সনদের কপিসংশ্লিষ্ট করনথি শনাক্ত করা
জাতীয় পরিচয়পত্র বা প্রযোজ্য পরিচয়পত্রআবেদনকারীর পরিচয় যাচাই
প্রযোজ্য রিটার্নের প্রাপ্তিস্বীকারপূর্ববর্তী রিটার্ন দাখিলের তথ্য দেওয়া
কর পরিশোধের চালান বা প্রমাণপরিশোধিত করের তথ্য দেখানো
কারণের পক্ষে প্রমাণপত্রমৃত্যু, ব্যবসা বন্ধ বা অন্য কারণ সমর্থন করা

এটি সবার জন্য বাধ্যতামূলক সরকারি তালিকা নয়। আপনার ক্ষেত্রে কোন নথি প্রয়োজন এবং কপিগুলো সত্যায়িত করতে হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে নিশ্চিত করুন।

টিন সার্টিফিকেট বাতিলের আবেদন করবেন যেভাবে

১. নিজের কর সার্কেল শনাক্ত করুন

টিআইএন সনদ ও করনথি থেকে কর অঞ্চল এবং সার্কেলের তথ্য দেখুন। নথি অন্য সার্কেলে স্থানান্তর হয়ে থাকলে বর্তমানে কোন দপ্তর সেটি পরিচালনা করছে, তা নিশ্চিত করুন।

২. আবেদন জমার পদ্ধতি জেনে নিন

সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করে আবেদন কোথায় ও কীভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে, তা জানুন। নির্ধারিত ফরম বা বিশেষ নির্দেশনা থাকলে সেটি সংগ্রহ করুন।

৩. কারণ উল্লেখ করে আবেদন লিখুন

আবেদনে নাম, টিআইএন, ঠিকানা, যোগাযোগের নম্বর এবং বাতিলের কারণ লিখুন। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কোন সময় থেকে আয় বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে, তা উল্লেখ করুন। তথ্যের সমর্থনে নথি যুক্ত করুন।

৪. আবেদন জমার প্রমাণ রাখুন

আবেদন ও সংযুক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ কপি নিজের কাছে রাখুন। জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকার, গ্রহণের তারিখ কিংবা রেফারেন্স নম্বর সংগ্রহ করুন। পরে অগ্রগতি জানতে এগুলো কাজে লাগবে।

৫. কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য দিন

অতিরিক্ত নথি বা ব্যাখ্যা চাওয়া হলে তা জমা দিন। শুনানির নির্দেশ থাকলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে অংশ নিন।

৬. সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করুন

আবেদন অনুমোদিত হয়েছে কি না এবং নিবন্ধনের অবস্থা পরিবর্তিত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে নিশ্চিত করুন। অনুমোদনের আদেশ বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।

টিন বাতিলের আবেদনপত্রের নমুনা

বরাবর
উপকর কমিশনার
কর সার্কেল: [সার্কেল নম্বর]
কর অঞ্চল: [কর অঞ্চলের নাম]

বিষয়: টিআইএন নিবন্ধন বাতিলের আবেদন।

মহোদয়,

আমি [নাম], টিআইএন নম্বর [১২ সংখ্যার টিআইএন], আপনার কর সার্কেলের একজন নিবন্ধিত করদাতা।

[এখানে নিবন্ধন বাতিলের প্রকৃত কারণ, প্রাসঙ্গিক সময়কাল এবং প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা লিখুন।]

আমার করনথি ও সংযুক্ত কাগজপত্র যাচাই করে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী টিআইএন নিবন্ধন বাতিলের আবেদন বিবেচনার অনুরোধ করছি।

সংযুক্তি:
১. টিআইএন সনদের কপি।
২. পরিচয়পত্রের কপি।
৩. আবেদনের কারণের পক্ষে প্রাসঙ্গিক নথি।
৪. কর সার্কেলের নির্দেশনা অনুযায়ী অন্যান্য কাগজপত্র।

নাম:
ঠিকানা:
মোবাইল নম্বর:
তারিখ:
স্বাক্ষর:

এটি সাধারণ নমুনা; সরকারি নির্ধারিত ফরম নয়। নিজের পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে।

টিন বাতিল করতে কত সময় ও খরচ লাগে?

যাচাইকৃত সরকারি সূত্রে এই সেবার জন্য সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও ফি নিশ্চিত করা যায়নি। তাই নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে টিআইএন বাতিলের নিশ্চয়তা দেওয়া ঠিক হবে না।

আবেদন গ্রহণকারী কার্যালয় থেকে প্রযোজ্য ফি ও প্রক্রিয়া জেনে নিন। সরকারি ফি থাকলে তার রসিদ সংগ্রহ করুন। কর আইনজীবী বা পরামর্শকের সহায়তা নিলে তাঁর পারিশ্রমিক সরকারি ফি থেকে আলাদা।

আবেদন করার পর কি রিটার্ন দেওয়া বন্ধ করা যাবে?

আবেদন জমা দেওয়া মানেই নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। তাই আবেদন চলমান থাকা অবস্থায় নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আছে কি না, তা যাচাই করুন।

একইভাবে টিআইএন বাতিলের আবেদন করে পুরোনো করদায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কোনো বকেয়া বা অসম্পূর্ণ কার্যক্রম থাকলে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সেটির নিষ্পত্তি করতে হবে।

সচরাচর প্রশ্ন

আয় না থাকলে কি টিন বাতিল করা যায়?

আয় না থাকার কারণ, ভবিষ্যৎ আয়ের পরিস্থিতি এবং নিবন্ধন ও রিটার্নসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা বিবেচনা করতে হবে। শুধু বর্তমানে আয় নেই—এই তথ্য দিয়ে অনুমোদন নিশ্চিত হয় না।

ভুল করে টিন খুললে কী করব?

ভুল নিবন্ধনের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলে যোগাযোগ করুন। একাধিক টিআইএন থাকলে সব নম্বরের তথ্য দিন।

চাকরি চলে গেলে কি টিন বাতিল হবে?

চাকরি হারালেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে না। অন্য আয়, ব্যবসা বা প্রযোজ্য বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, তা বিবেচ্য।

মৃত ব্যক্তির টিনের বিষয়ে কী করতে হবে?

উত্তরাধিকারী বা আইনগত প্রতিনিধি মৃত্যু সনদ ও প্রাসঙ্গিক নথিসহ সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলে যোগাযোগ করবেন। মৃত ব্যক্তির ব্যবসা বা করসংক্রান্ত বিষয় থাকলে সেগুলোর নিষ্পত্তির পদ্ধতিও জেনে নিতে হবে।

বিদেশে থাকলে কি টিন বাতিল করা যাবে?

বিদেশে অবস্থান করাই যথেষ্ট নয়। স্থায়ীভাবে দেশত্যাগ, বাংলাদেশে আয়মূলক কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত বিবেচনা করা হবে।

টিন বাতিল ও রিটার্ন দাখিল থেকে অব্যাহতি কি একই?

না। একটি নিবন্ধনের অবস্থা পরিবর্তনের বিষয়; অন্যটি রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। নিজের ক্ষেত্রে কোন বিধান প্রযোজ্য, তা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।

বাতিলের পর আবার টিআইএন প্রয়োজন হলে কী করব?

আগের টিআইএন ও বাতিলের আদেশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেলে যোগাযোগ করুন। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছাড়া নতুন করে আরেকটি নিবন্ধন করবেন না।

সূত্র: এনবিআরের আয়করবিষয়ক প্রশ্নোত্তর এবং আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬২ ধারা।