পর্তুগালের বিচারিক পুলিশ (PJ) অংশ নেওয়া একটি বড় আন্তর্জাতিক অভিযানে মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসন, মাদক ও অস্ত্র পাচারের সঙ্গে জড়িত একটি আন্তঃদেশীয় অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ‘অপারেশন SALEM’ নামের এ অভিযানে স্পেন ও আলজেরিয়ায় মোট ৭৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে ১৮টি উচ্চগতির স্পিডবোট।
পর্তুগালের প্রধান অপরাধ তদন্ত সংস্থা PJ জানিয়েছে, স্প্যানিশ ন্যাশনাল পুলিশ ও স্প্যানিশ সিভিল গার্ডের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ইউরোপীয় পুলিশ সংস্থা ইউরোপোল (Europol)-এর সহায়তা ছিল। অভিযানের অংশ হিসেবে স্পেনে ১৭টি স্থানে তল্লাশি চালানো হয় এবং ১৮টি স্পিডবোট জব্দ করা হয়।
ইউরোপোলের তথ্য অনুযায়ী, জব্দ করা স্পিডবোটগুলোর মূল্য ৫০ লাখ ইউরোর বেশি। কয়েকটি নৌযানের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৪ মিটার এবং প্রতিটিতে তিন থেকে চারটি ইঞ্জিন ছিল।
অভিযানে অস্ত্র ও গোলাবারুদ, ২৫ হাজার ইউরোর বেশি নগদ অর্থ, মাদক, স্যাটেলাইট মোবাইল ফোন, জিপিএস ডিভাইস ও স্যাটেলাইট ডিশসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদ এবং অর্থ স্থানান্তরের অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের তথ্যও উদ্ধার করা হয়েছে।
মাদক ও অভিবাসী পাচারে ছিল দ্বিমুখী রুট
ইউরোপোল জানিয়েছে, অপরাধী চক্রটি অনেকটা একটি ‘লজিস্টিকস কোম্পানি’র মতো কাজ করত। শুরুতে মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে তারা মানবপাচার, অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাচারসহ একাধিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
স্পেন ও পর্তুগাল থেকে আলজেরিয়ার দিকে যাওয়ার পথে সিনথেটিক মাদক, বিশেষ করে এমডিএমএ, আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক পাচার করা হতো। বিপরীত পথে আলজেরিয়া থেকে স্পেনে অভিবাসীদের পাচার করা হতো।
একজন অভিবাসীকে ইউরোপে পাচারের জন্য সর্বোচ্চ ১২ হাজার ইউরো পর্যন্ত নেওয়া হতো বলে জানিয়েছে ইউরোপোল। একটি যাত্রায় ৫০ জনেরও বেশি অভিবাসীকে পাচার করা সম্ভব ছিল। সব মিলিয়ে মানবপাচার থেকে চক্রটির আয় ২ কোটি ৪০ লাখ ইউরোর বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পর্তুগালেও ছিল চক্রটির কার্যক্রম
অভিযানে উঠে এসেছে, অপরাধী চক্রটির কার্যক্রম শুধু স্পেন ও আলজেরিয়ায় সীমাবদ্ধ ছিল না। পর্তুগাল, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পোল্যান্ডেও তাদের যোগাযোগ ও কার্যক্রমের ঘাঁটি ছিল।
চক্রটির মূল কার্যক্রম স্পেনে কেন্দ্রীভূত ছিল। আলমেরিয়া, মুরসিয়া, কার্টাজেনা ও আলিকান্তে থেকে তারা বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করত। এছাড়া ইবিজা ও ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলের মার্সেই শহরের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ ছিল।
ইউরোপোল জানিয়েছে, চক্রটির অধিকাংশ সন্দেহভাজন আলজেরীয় নাগরিক। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, ইতালি ও পোল্যান্ডের বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল। এমনকি নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামভিত্তিক ‘মক্রো মাফিয়া’ এবং মার্সেইভিত্তিক ‘মার্সেই মিলিউ’-এর সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
কয়েক হাজার অভিবাসী পাচারের অভিযোগ
PJ-এর ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি কয়েক হাজার অভিবাসীকে নিয়োগ ও পরিবহন করে অবৈধভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করিয়েছে। একই সঙ্গে মাদক, অস্ত্র ও বিস্ফোরক পরিবহনের পাশাপাশি অন্যান্য অপরাধী গোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দিত তারা।
চক্রটি অত্যন্ত সংগঠিত কাঠামোয় পরিচালিত হতো এবং সদস্যদের কেউ কারাগারে থাকলেও তাদের কার্যক্রম চালু রাখার মতো স্থায়ী ব্যবস্থাপনা ছিল। অভিবাসী ও নিজেদের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে অস্ত্র, হুমকি এমনকি ভাড়াটে হামলাকারী ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক এ অভিযানে পর্তুগাল, ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অংশ নেয়। অভিযানের মাধ্যমে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মানবপাচার, মাদক ও অস্ত্র পাচারের একটি বড় নেটওয়ার্কে উল্লেখযোগ্য আঘাত হানা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
