অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো এবং ইউরোপের সীমান্তের বাইরে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ জোরদারের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার ছিলেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। এবার সেই নীতিরই উল্টো চাপে পড়েছেন তিনি। ইউরোপের একাধিক দেশ ইতালির কাছে এখন এমন আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে, যারা প্রথমে ইতালি হয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করেছিলেন।
সর্বশেষ আয়ারল্যান্ড ইতালিকে এমন অভিবাসীদের ফেরত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এর আগে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নেদারল্যান্ডসও একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।
বিষয়টির মূল ভিত্তি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তি। ২০২৬ সালের জুনে কার্যকর হওয়া এই নতুন ব্যবস্থায় ডাবলিন নীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বহাল রাখা হয়েছে। সেই নীতি অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে আসা কোনো ব্যক্তি প্রথম যে সদস্যদেশে প্রবেশ করে এবং সেখানে আশ্রয়ের আবেদন করে, সাধারণত সেই দেশকেই তার আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়ার দায়িত্ব নিতে হয়।
মেলোনির জন্য নীতির উল্টো ফল
২০২২ সালে মেলোনি ক্ষমতায় আসার কয়েক সপ্তাহ পর ইতালি একতরফাভাবে ডাবলিন ব্যবস্থার আওতায় অন্যান্য দেশ থেকে অভিবাসী ফেরত নেওয়া স্থগিত করেছিল। তখন ইতালি বাস্তব পরিস্থিতি ও অভ্যর্থনা সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছিল।
ইউরোপীয় কমিশন ইতালির এই অবস্থানকে ডাবলিন ব্যবস্থার অধীনে দেশটির দায়িত্বের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদালতের কয়েকটি রায়েও ইতালির দায়িত্বের বিষয়টি উঠে এসেছে।
তবে নতুন অভিবাসন চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। নতুন ব্যবস্থায় এক সদস্যদেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাওয়া আশ্রয়প্রার্থীদের প্রথম প্রবেশের দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হয়েছে।
আগের নিয়মে কোনো দেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিবাসী ফেরত নেওয়ার অনুরোধ করতে হতো এবং সংশ্লিষ্ট দেশকে তা গ্রহণ করতে হতো। নতুন ব্যবস্থায় এই প্রক্রিয়ার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত সহজ একটি অবহিতকরণ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। ফলে ইতালির মতো দেশগুলোর জন্য ফেরত নেওয়ার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ইতালির সমর্থনেই নতুন নিয়ম
আশ্চর্যের বিষয় হলো, নতুন অভিবাসন নীতিতে ইতালি নিজেই সমর্থন দিয়েছে।
মেলোনি নিজেও নতুন চুক্তিকে ইতালির জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, নতুন নিয়ম প্রথম প্রবেশের দেশগুলোর স্বার্থ আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত করবে এবং নিরাপদ তৃতীয় দেশের নীতি জোরদার হওয়ায় দ্রুত অভিবাসী ফেরত পাঠানোর সুযোগ বাড়বে।
কিন্তু এখন একই নিয়মের আওতায় ইতালিকেই অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোতে যাওয়া অভিবাসীদের ফেরত নিতে বলা হচ্ছে।
ইতালিতে সমুদ্রপথে বিপুল অভিবাসী
ইতালিকে ঘিরে এই চাপের পেছনে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানও বড় কারণ। ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ ইতালি।
২০২৫ সালে সমুদ্রপথে ৬৬ হাজারের বেশি অনিয়মিত অভিবাসী ইতালিতে পৌঁছান। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তে প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার অনিয়মিত প্রবেশের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়।
নতুন চুক্তিতে অভিবাসনপ্রবণ দেশগুলোর ওপর চাপ কমাতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বাধ্যতামূলক সংহতি ব্যবস্থার কথাও রয়েছে। তবে ২০২৬ সালে মাত্র ৮ হাজার ৮৭৮ জন অভিবাসীকে চাপের মুখে থাকা দেশগুলো থেকে অন্য সদস্যদেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে, যা সামগ্রিক চাপের তুলনায় খুবই কম।
‘রিটার্ন হাব’ নিয়েও বিতর্ক
অভিবাসীদের ইউরোপের বাইরে ফেরত পাঠাতে ‘রিটার্ন হাব’ তৈরির উদ্যোগও ইউরোপে জোরালো হচ্ছে। ইতালি আলবেনিয়ায় এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। তবে ইতালির আদালতগুলো বারবার এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
জার্মানি, অস্ট্রিয়া, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্কও ইউরোপের বাইরে রিটার্ন হাব তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। উগান্ডায় এমন একটি কেন্দ্র স্থাপনের আলোচনা এগিয়ে যাওয়ার খবরও এসেছে।
তবে তৃতীয় কোনো দেশে অভিবাসীদের পাঠাতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে আইনি ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা প্রয়োজন। ফলে এসব কেন্দ্র দ্রুত সমস্যার সমাধান দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ কারণেই আপাতত ইউরোপের ভেতরেই প্রথম প্রবেশের দেশ হিসেবে ইতালিতে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্পেন ও ফ্রান্সের অবস্থান ভিন্ন
তবে ইউরোপের সব দেশ ইতালিতে অভিবাসী ফেরত পাঠানোর পক্ষে নয়। স্পেন ও ফ্রান্স স্পষ্টভাবে ইতালিতে ডাবলিন ব্যবস্থার আওতায় ফেরত পাঠানোর বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে।
মজার বিষয় হলো, এই দুই দেশই মেলোনির সমর্থিত ইউরোপের বাইরের ‘রিটার্ন হাব’ ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছে এবং এগুলোকে কার্যকর নয় বলে মনে করে।
ফলে অভিবাসন ইস্যুতে ইউরোপের পুরোনো বিভাজন আবারও সামনে এসেছে—একদিকে প্রথম প্রবেশের দেশগুলো, অন্যদিকে অভিবাসীদের চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত দেশগুলো।
রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে। ইতালি, ফ্রান্স ও স্পেনসহ কয়েকটি দেশে আগামী বছর নির্বাচন সামনে থাকায় কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর উত্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইতালির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও মেলোনি নতুন কট্টর ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছেন। ফলে অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন নিয়মের বাস্তব প্রয়োগ সামলানো তার সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
