ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের আলোচনা আবার শুরু করা হবে কি না—এ প্রশ্নে শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬, গণভোটে যাচ্ছেন আইসল্যান্ডের ভোটাররা।
“আইসল্যান্ডের কি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করা উচিত?”—এই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ অথবা না ভোটের মাধ্যমে দেবেন প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ভোটার।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই গণভোটে আইসল্যান্ড সরাসরি ইইউতে যোগ দেবে কি না, সেটি নির্ধারণ করা হচ্ছে না। ভোটে শুধু সিদ্ধান্ত হবে—দেশটি আবার ইইউ সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা শুরু করবে কি না। শেষ পর্যন্ত সদস্যপদ গ্রহণের সিদ্ধান্ত হলে সেটির জন্য আলাদা গণভোট এবং ইইউর ২৭ সদস্য দেশের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত
ভোটের আগে প্রকাশিত জরিপগুলোতে দুই পক্ষের ব্যবধান খুবই কম। আগস্টে জরিপ সংস্থা Maskína-র এক জরিপে ৫১.৩ শতাংশ মানুষ ইইউর সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর পক্ষে এবং ৪৮.৭ শতাংশ বিপক্ষে মত দিয়েছেন।
ফলে শনিবারের গণভোটের ফলাফল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চিত থাকতে পারে।
ইইউ প্রশ্নটি আইসল্যান্ডের রাজনীতিতে নতুন করে বিভাজন তৈরি করেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনীতি, মৎস্যসম্পদ ও কৃষির পাশাপাশি রাশিয়ার প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্কও ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কেন আবার ইইউর দিকে তাকাচ্ছে আইসল্যান্ড?
আইসল্যান্ড ২০০৯ সালে প্রথম ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের আবেদন করে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা আসে। সে সময় ইইউতে যোগদানকে আইসল্যান্ডের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দেশটির মুদ্রা ‘ক্রোনা’কে শক্তিশালী করার সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখা হয়েছিল।
২০১০ সালে আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু ইউরোপবিরোধী একটি সরকারের সময় ২০১৩ সালে সেই প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়।
এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে বিষয়টি অনেকটা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি বদলেছে।
বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। একই সময়ে আইসল্যান্ডে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইইউতে যোগদানের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ইইউতে যোগ দিলে কী লাভ হতে পারে?
আইসল্যান্ড বর্তমানে ইইউর সদস্য না হলেও ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEA)-এর সদস্য। এর মাধ্যমে দেশটি ইউরোপীয় একক বাজারে প্রবেশাধিকার পায়।
EEA ব্যবস্থার কারণে আইসল্যান্ড ইতোমধ্যে ইইউর বিপুলসংখ্যক আইন ও বিধি গ্রহণ করেছে। ফলে ইইউপন্থীরা যুক্তি দিচ্ছেন, যখন দেশকে এসব নিয়মের অনেকটাই অনুসরণ করতে হচ্ছে, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে সরাসরি থাকার জন্য পূর্ণ সদস্যপদ উপকারী হতে পারে।
ইইউপন্থীদের আরেকটি যুক্তি হলো অর্থনীতি ও বাণিজ্য। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ইইউর বৃহৎ বাজারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আইসল্যান্ডের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে।
কেন ইইউর বিরোধিতা করছেন অনেকে?
বিরোধীদের সবচেয়ে বড় আপত্তিগুলোর একটি হলো—আইসল্যান্ড ইতোমধ্যে EEA-এর মাধ্যমে ইউরোপীয় একক বাজারের সুবিধা পাচ্ছে। তাই পূর্ণ সদস্যপদের প্রয়োজন নেই। আরেকটি বড় বিষয় হলো মৎস্যসম্পদ।
আইসল্যান্ডের অর্থনীতিতে মাছ ও মৎস্যশিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মৎস্যখাত GDP-এর প্রায় ৬.৫ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস।
ইইউর Common Fisheries Policy (CFP) সদস্য দেশগুলোর মাছ ধরার সীমা ও কোটা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আইসল্যান্ডের অনেক মৎস্যজীবী ও শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আশঙ্কা করছেন, ইইউতে যোগ দিলে নিজেদের সমুদ্রসীমা ও মাছ ধরার নীতির ওপর স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ কমে যেতে পারে।
‘ম্যাকারেল যুদ্ধ’ এখনও আলোচনায়
মৎস্যসম্পদ নিয়ে আইসল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পুরোনো বিরোধও এবার আলোচনায় এসেছে।
‘ম্যাকারেল যুদ্ধ’ নামে পরিচিত বিরোধে আইসল্যান্ড ম্যাকারেল মাছের জন্য একতরফাভাবে বড় কোটা নির্ধারণ করেছিল। ইইউ সেটিকে অতিরিক্ত হিসেবে দেখেছিল।
এই বিরোধ আইসল্যান্ডের আগের ইইউ সদস্যপদ আলোচনাকেও জটিল করে তুলেছিল। তাই এবারও মৎস্যনীতি সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর আর্কটিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব দ্রুত বেড়েছে। রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কারণে উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ন্যাটো ও ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ছে।
আইসল্যান্ড ন্যাটোর সদস্য হলেও দেশটির নিজস্ব স্থায়ী সেনাবাহিনী নেই। ১৯৫১ সালের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে আইসল্যান্ডের প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বারবার করা মন্তব্য এবং উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা আইসল্যান্ডেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইইউপন্থীরা মনে করছেন, ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভবিষ্যতে আইসল্যান্ডকে বাড়তি নিরাপত্তা দিতে পারে।
ইতোমধ্যে আইসল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও জোরদার হয়েছে।
ইইউ কী বলছে?
ইউরোপীয় কমিশন আইসল্যান্ডকে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে দেখে। ইইউর কর্মকর্তাদের মতে, আইসল্যান্ডের মূল্যবোধ, ইউরোপীয় বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নিরাপত্তাগত অবস্থান ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দেশটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করেছে।
ইইউর সম্প্রসারণবিষয়ক কমিশনার মার্তা কোসের বক্তব্য অনুযায়ী, আইসল্যান্ডের আগের আবেদন এখনও কার্যকর থাকায় দেশটি চাইলে তুলনামূলক দ্রুত সদস্যপদ আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরায় শুরু করতে পারে।
২০১৩ সালে আলোচনা স্থগিত হওয়ার আগে ৩৫টি আলোচ্য অধ্যায়ের মধ্যে ২৭টি খোলা হয়েছিল এবং ১১টি সাময়িকভাবে বন্ধও করা হয়েছিল। তবে মৎস্যসম্পর্কিত অধ্যায়টি ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি।
ইইউর পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে আইসল্যান্ডের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে মৎস্যসম্পদসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সমঝোতার সুযোগ রয়েছে।
শনিবার কী হবে?
২৯ আগস্ট স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় ভোটগ্রহণ শুরু হবে এবং রাত ১০টায় শেষ হবে। এরপর ধাপে ধাপে ফলাফল প্রকাশ করা হবে।
ভোটে যদি ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়, তাহলে আইসল্যান্ডের সরকার ইইউর সঙ্গে সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করার রাজনৈতিক অনুমোদন পাবে।
আর ‘না’ জয়ী হলে ইইউ সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা আবারও দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে।
তবে যেকোনো ক্ষেত্রেই শনিবারের ভোট ইইউ সদস্য হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। এটি মূলত নির্ধারণ করবে—আইসল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের দরজায় আবার আনুষ্ঠানিকভাবে কড়া নাড়বে কি না।
আইসল্যান্ডের আয়তন ও জনসংখ্যা তুলনামূলক ছোট হলেও উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলে এর কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতি, মাছ, ইউরোপীয় বাজার, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে শনিবারের ভোট শুধু ইইউ সদস্যপদ নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত নয়; এটি আইসল্যান্ড আগামী দশকগুলোতে ইউরোপের সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকতে চায়, সেই প্রশ্নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা।
