সুইডেন ছাড়লে ৩৫০,০০০ ক্রোনা, তবু আগ্রহ কম অভিবাসীদের

Sweden immigration

স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চাইলে যোগ্য প্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজার সুইডিশ ক্রোনা আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে সুইডেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৪৫ লাখ টাকার কাছাকাছি হতে পারে। তবে এত বড় অঙ্কের প্রণোদনা দেওয়ার পরও দেশটি ছাড়তে অভিবাসীদের মধ্যে প্রত্যাশিত আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।

Reuters-এর ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৭১ জন এই বর্ধিত স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন সহায়তা গ্রহণ করেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নতুন পরিমাণের এই আর্থিক সহায়তা কার্যকর হয়েছে।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক পাবেন সর্বোচ্চ ৩৫০,০০০ ক্রোনা

সুইডিশ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছুক যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য আর্থিক সহায়তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।

নতুন নিয়মে—

প্রাপ্তবয়স্ক একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৩৫০,০০০ ক্রোনা, ১৮ বছরের কম বয়সী একজন শিশু ২৫,০০০ ক্রোনা, স্বামী-স্ত্রী বা একসঙ্গে বসবাসকারী দম্পতি সর্বোচ্চ ৫০০,০০০ ক্রোনা এবং একটি পরিবার সর্বোচ্চ ৬০০,০০০ ক্রোনা পর্যন্ত পেতে পারে।

এর আগে একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য এই সহায়তার পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ মাত্র ১০,০০০ ক্রোনা এবং পুরো পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ ৪০,০০০ ক্রোনা। ফলে নতুন ব্যবস্থায় আর্থিক সহায়তা কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে।

সুইডিশ সরকারের স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন সহায়তার বিস্তারিত তথ্য

কারা এই টাকা পাবেন?

এই অর্থ সুইডেনে বসবাসরত সব বিদেশি নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত নয়।

সুইডিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ধরনের বৈধ রেসিডেন্স পারমিটধারী ব্যক্তিরা এই সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারেন। এর মধ্যে শরণার্থী হিসেবে রেসিডেন্স পারমিট পাওয়া ব্যক্তি, subsidiary protection পাওয়া ব্যক্তি এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তাদের পরিবারের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারেন।

তাদের স্বেচ্ছায় সুইডেন ছেড়ে নিজ দেশ অথবা অন্য কোনো দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অন্যদিকে যাদের দেশ ছাড়ার বা বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, তাদের জন্য এই নির্দিষ্ট repatriation grant প্রযোজ্য নয় বলে সরকারি তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

৩৫০,০০০ ক্রোনা দিয়েও সাড়া কম কেন?

সরকার বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা চালু করলেও গ্রহণকারীর সংখ্যা এখনো খুবই কম।

Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত মাত্র ১৭১ জন এই সুযোগ নিয়েছেন। অনেক অভিবাসী সুইডেনে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন এবং সেখানে পরিবার, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবন গড়ে তুলেছেন। ফলে শুধু আর্থিক প্রণোদনার কারণে স্থায়ীভাবে দেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেকের জন্য সহজ নয়।

সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, যারা সুইডিশ সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি বা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে রয়েছেন, তাদের নিজ দেশে নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ তৈরি করতেই এই আর্থিক সহায়তা বাড়ানো হয়েছে।

১৯৮৪ সাল থেকেই রয়েছে এই ব্যবস্থা

অভিবাসীদের স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তা সুইডেনে সম্পূর্ণ নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়।

সুইডিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৪ সাল থেকেই দেশটিতে voluntary repatriation grant ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অতীতে সহায়তার পরিমাণ অনেক কম ছিল এবং খুব কম মানুষই এর সুবিধা গ্রহণ করেছেন।

এই কারণেই ২০২৬ সাল থেকে সহায়তার অঙ্ক নাটকীয়ভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

প্রতারণা ঠেকাতেও নতুন ব্যবস্থা

আর্থিক সহায়তার পরিমাণ অনেক বেড়ে যাওয়ায় জালিয়াতি বা অপব্যবহারের ঝুঁকি ঠেকাতেও নিয়ম কঠোর করেছে সুইডেন।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আবেদন যাচাইয়ের সময় Swedish Migration Agency এখন নির্দিষ্ট অপরাধসংক্রান্ত তথ্য ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের রেকর্ড ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

সরকার জানিয়েছে, প্রকৃত যোগ্য আবেদনকারীরাই যাতে অর্থ পান এবং এই ব্যবস্থার অপব্যবহার না হয়, সেজন্য বাড়তি যাচাই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

অভিবাসন নীতিতে কঠোর হচ্ছে সুইডেন

স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তনের জন্য অর্থ বাড়ানো সুইডেনের সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতির বড় পরিবর্তনের একটি অংশ।

দেশটি গত কয়েক বছরে অভিবাসন, রেসিডেন্স পারমিট ও পারিবারিক অভিবাসনের বিভিন্ন নিয়মে কড়াকড়ি এনেছে।

PortuBangla-এর আগের প্রতিবেদনে সুইডেনে অভিবাসীদের জন্য নতুন কঠোর আইন এবং রেসিডেন্স পারমিট বাতিলের ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

সুইডেনে অভিবাসীদের জন্য নতুন কঠোর আইন, রেসিডেন্সি বাতিলের ক্ষমতা বাড়ল কর্তৃপক্ষের

সুইডিশ সরকার চলতি বছর শ্রম অভিবাসনের জন্য ন্যূনতম বেতনের শর্ত পরিবর্তন এবং পরিবারের সদস্যদের অভিবাসনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর শর্ত আনার পরিকল্পনাও জানিয়েছে।

নির্বাচন সামনে রেখে অভিবাসন আবার বড় ইস্যু

আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর সুইডেনের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে অভিবাসন নীতি দেশটির রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

Reuters বলছে, বর্তমান সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতির অন্যতম অংশ হিসেবে স্বেচ্ছায় দেশত্যাগে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। সরকারকে পার্লামেন্টে সমর্থন দেওয়া Sweden Democrats দীর্ঘদিন ধরে আরও কঠোর অভিবাসন নীতির পক্ষে অবস্থান করছে।

তবে এত বড় আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার পরও মাত্র অল্পসংখ্যক মানুষের সাড়া পাওয়ায় এই নীতির বাস্তব কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশিরাও কি আবেদন করতে পারবেন?

শুধু বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ার কারণে কেউ এই সহায়তা পাবেন বা পাবেন না—এভাবে বিষয়টি নির্ধারিত হয় না।

মূল বিষয় হলো আবেদনকারীর সুইডেনে কী ধরনের রেসিডেন্স পারমিট রয়েছে এবং তিনি সরকারি eligibility criteria পূরণ করেন কি না।

বিশেষ করে কাজের অনুমতি, শিক্ষার্থী রেসিডেন্স পারমিট বা অন্যান্য ধরনের অনুমতিপত্রধারীরা নিজেদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই অর্থের জন্য যোগ্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

আবেদন করার আগে Swedish Migration Agency-এর সর্বশেষ শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন।

ইউরোপে অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন

সুইডেনের এই পদক্ষেপ এমন সময়ে আলোচনায় এসেছে, যখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অনিয়মিত অভিবাসন কমানো, ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত পাঠানো এবং বৈধ অভিবাসনের নিয়ম কঠোর করার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে।

তবে সুইডেনের এই বিশেষ কর্মসূচি জোরপূর্বক বহিষ্কারের ব্যবস্থা নয়। এটি নির্দিষ্ট যোগ্য রেসিডেন্স পারমিটধারীদের জন্য স্বেচ্ছায় স্থায়ীভাবে দেশ ছাড়ার বিনিময়ে আর্থিক সহায়তা।

বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক একজন আবেদনকারীর জন্য সর্বোচ্চ ৩৫০,০০০ ক্রোনার সুযোগ থাকলেও ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে মাত্র ১৭১ জন এটি গ্রহণ করেছেন। ফলে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়েও কতটা মানুষকে স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে উৎসাহিত করা সম্ভব হবে, সেটিই এখন এই নীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সূত্র: Reuters, Government Offices of Sweden এবং Swedish Migration Agency।