অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগে ইসরায়েলি বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপের পথে এগোচ্ছে পর্তুগালসহ ১২টি দেশ।
৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এ অবস্থান জানিয়েছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং সেখানে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও নতুন বসতি সম্প্রসারণ নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশগুলো ইসরায়েল সরকারকে অবিলম্বে বসতি সম্প্রসারণ ও বেসামরিক প্রশাসনিক ক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে চায় ১২ দেশ?
যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, দেশগুলো নিজ নিজ জাতীয় আইনের আওতায় অথবা ইউরোপীয় পর্যায়ে এমন পণ্যের ওপর বাণিজ্য বিধিনিষেধ সমর্থন করবে, যেগুলো আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ বলে বিবেচিত ইসরায়েলি বসতি থেকে উৎপাদিত।
কিছু দেশ ইতোমধ্যে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার পথে এগিয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা বসতি থেকে আসা পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার জাতীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আয়ারল্যান্ড, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও বেলজিয়ামের নেওয়া পূর্ববর্তী পদক্ষেপকেও যৌথ বিবৃতিতে স্বাগত জানানো হয়েছে।
পর্তুগালসহ কয়েকটি দেশ বলেছে, তারা জাতীয় বিধিনিষেধ অথবা ইউরোপীয় পদক্ষেপ সমর্থনের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
বসতি সম্প্রসারণ বন্ধের দাবি
১২ দেশের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল সরকারকে পশ্চিম তীরে নতুন বসতি সম্প্রসারণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
বিশেষ করে E1 বসতি প্রকল্পের জন্য দরপত্র প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে দেশগুলো। তাদের মতে, এ ধরনের সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে একটি কার্যকর ও ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
একই সঙ্গে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তেরও দাবি জানানো হয়েছে।
দুই-রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি সমর্থন
যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের বৈধ নিরাপত্তা স্বার্থ স্বীকার করা হয়েছে এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলারও পুনরায় নিন্দা জানানো হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে দেশগুলো বলেছে, তাদের লক্ষ্য একটি দুই-রাষ্ট্র সমাধান, যেখানে ইসরায়েল এবং একটি সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র নিরাপদ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তের মধ্যে পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করবে।
যুক্তরাজ্যের আরও কঠোর পদক্ষেপ
যৌথ বিবৃতির পাশাপাশি যুক্তরাজ্য পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিকে লক্ষ্য করে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড সংসদে জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য অধিকৃত ভূখণ্ডের অবৈধ বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করবে।
এছাড়া বসতি সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত নির্মাণ, অবকাঠামো, অর্থায়ন কিংবা আবাসন কার্যক্রমে সহায়তাকারী নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের নতুন কাঠামোর আওতায় অবৈধ বসতির প্রচার বা বিজ্ঞাপনও নিষিদ্ধ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
“জাতিগত নির্মূল” অভিযোগ
ব্রিটিশ সংসদে দেওয়া বক্তব্যে এড মিলিব্যান্ড পশ্চিম তীরে কিছু বসতি স্থাপনকারীর কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন এবং ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুতর বলে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের নতুন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ইসরায়েল রাষ্ট্র নয়; বরং অধিকৃত ভূখণ্ডে অবৈধ বসতি ও বসতি সম্প্রসারণে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
ইসরায়েলের তীব্র প্রতিক্রিয়া
পশ্চিম তীরের বসতি নিয়ে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের নতুন পদক্ষেপের পর ইসরায়েল তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
Reuters-এর ৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের স্বীকৃতি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য বলছে, নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক আইন ও দুই-রাষ্ট্র সমাধান রক্ষা করা।
পশ্চিম তীরের বসতি নিয়ে বিরোধ কেন?
১৯৬৭ সালের আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম তীর ইসরায়েলের দখলে রয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির পাশাপাশি পাঁচ লাখের বেশি ইসরায়েলি বসবাস করেন বিভিন্ন বসতিতে।
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশ এসব বসতিকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে বিবেচনা করে। ইসরায়েল এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয় এবং নিরাপত্তা ও ঐতিহাসিক দাবিসহ বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর পশ্চিম তীরে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বসতি সম্প্রসারণও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
পর্তুগালের অবস্থান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পর্তুগাল এই যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ১২ দেশের একটি।
এর মাধ্যমে লিসবন স্পষ্ট করেছে যে পশ্চিম তীরের বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি-সংক্রান্ত বাণিজ্যের বিষয়ে আরও কঠোর জাতীয় বা ইউরোপীয় পদক্ষেপের পক্ষে তারা অবস্থান নিতে প্রস্তুত।
PortuBangla-তে এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন পড়তে পারেন:
পর্তুগালের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কসংক্রান্ত আরও খবর পাওয়া যাবে:
সামনে কী হতে পারে?
যৌথ বিবৃতিতে সব ১২ দেশ একই ধরনের তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে—এমনটি বলা হয়নি।
বরং কিছু দেশ ইতোমধ্যে আমদানি নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে, আর পর্তুগালসহ অন্যরা জাতীয় বা ইউরোপীয় পর্যায়ের বাণিজ্য বিধিনিষেধ সমর্থন বা বিবেচনা করছে।
ফলে পর্তুগাল ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা নেবে এবং কখন তা কার্যকর হবে, সেটি দেশটির পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
তবে পশ্চিম তীরের বসতি ইস্যুতে ইউরোপীয় ও পশ্চিমা কয়েকটি দেশের সম্মিলিত অবস্থান যে আরও কঠোর হচ্ছে, ১২ দেশের এই যৌথ ঘোষণা সেটিই স্পষ্ট করছে।
সূত্র: যুক্তরাজ্যের Foreign, Commonwealth & Development Office-এর ১২ দেশের যৌথ বিবৃতি এবং ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদীয় বক্তব্য।
