২১ বছর ধরে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সির সঙ্গে প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন লিওনেল মেসি। সেই দীর্ঘ গল্পের শেষ পাতাটিও যেন লেখা হলো তাঁর মতো করেই—গোল, অ্যাসিস্ট, জয়, কান্না আর গ্যালারিভরা মানুষের ভালোবাসায়।
আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ তাই কেবল একজন ফুটবলারের বিদায় ছিল না। এটি ছিল একটি যুগের সমাপ্তি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিকে নিজের পরিচয়ের অংশ বানিয়ে ফেলা মেসি যখন শেষবার মাঠ ছাড়লেন, তখন আবেগে ভেসেছে পুরো স্টেডিয়াম।
১০ নম্বরেই লেখা ছিল বিদায়ের আবেগ
বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে হাজারো দর্শকের চোখ ছিল একজনের ওপর। কারও হাতে আর্জেন্টিনার পতাকা, কারও গায়ে ১০ নম্বর জার্সি। আর মাঠে পরিচিত সেই মানুষটি—বাঁ হাতে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড, পিঠে চেনা ১০ নম্বর।
আর্জেন্টিনার ফুটবলে ১০ নম্বর জার্সির ইতিহাস এমনিতেই বিশেষ। ডিয়েগো ম্যারাডোনার পর সেই সংখ্যাকে নতুন একটি যুগের প্রতীক বানিয়েছেন মেসি। তাঁর বিদায়ী ম্যাচে তাই ফলের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল মুহূর্তগুলো।
ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, এটি সাধারণ কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ নয়। দর্শকের করতালি, স্লোগান আর আবেগে বারবার ফিরে আসছিল মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের স্মৃতি।
যে সমর্থকদের ভালোবাসা পেতে একসময় তাঁকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছিল, শেষ রাতে সেই ভালোবাসাতেই যেন ডুবে গেলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
শেষ ম্যাচেও দেখা গেল পরিচিত মেসিকে
বিদায়ী ম্যাচেও মেসির ফুটবল ছিল পরিচিত ছন্দে। সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করা, আক্রমণের গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং গোলের মুহূর্তে নিজেকে সামনে নিয়ে আসা—সবই ছিল তাঁর খেলায়।
প্রথমার্ধের পর ম্যাচের গতি বাড়ায় আর্জেন্টিনা। মেসির তৈরি করা সুযোগ থেকে আসে গোল, এরপর আরও একটি আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
একসময় নিজেও গোলের দেখা পান মেসি। পুরো স্টেডিয়াম তখন একসঙ্গে গর্জে ওঠে। দর্শকদের অনেকেই মোবাইল ফোন তুলে ধরে মুহূর্তটি ধরে রাখেন। কারণ তাঁরা জানতেন, আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির এমন মুহূর্ত আর হয়তো দেখা যাবে না।
নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচেও গোল ও অ্যাসিস্টে অবদান রেখে মেসি মনে করিয়ে দিলেন, কেন দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্র ছিলেন তিনি।
শেষ বাঁশির পর মেসির চোখে জল
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজলেও মনুমেন্টালের রাত তখনো শেষ হয়নি। সতীর্থরা এগিয়ে এসে মেসিকে জড়িয়ে ধরেন। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরাও জানান সম্মান। গ্যালারি থেকে একটানা ভেসে আসে তাঁর নাম।
মেসির চোখেও তখন আবেগ স্পষ্ট। সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে বিদায়ের মুহূর্তটি আরও ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে।
জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ পথচলায় মেসিকে অনেক কঠিন সময় পেরোতে হয়েছে। ফাইনালে হার, সমালোচনা, ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা এবং একসময় জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত—সবই ছিল সেই যাত্রায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর গল্পের সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশটি লেখা হয়েছে আর্জেন্টিনার জার্সিতেই।
হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেক থেকে বিশ্বকাপ জয়
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটাও ছিল নাটকীয়। ২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে বদলি হিসেবে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক হয়েছিল তাঁর। কিন্তু মাঠে নামার অল্প সময়ের মধ্যেই লাল কার্ড দেখে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল তরুণ মেসিকে।
সেই অপ্রত্যাশিত শুরু থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় নাম।
২০০৬ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন মেসি। ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যান বিশ্বকাপের ফাইনালে। তবে জার্মানির বিপক্ষে সেই ফাইনালে হারের পর শুরু হয় নতুন করে সমালোচনা।
এরপর কোপা আমেরিকার ফাইনালেও বারবার হতাশ হতে হয় তাঁকে। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। পরে সিদ্ধান্ত বদলে ফিরে আসেন।
সেই ফিরে আসাই বদলে দেয় পুরো গল্প।
২০২১ সালে মেসির নেতৃত্বে কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। ২০২২ সালে আসে ফিনালিসিমার শিরোপা। এরপর কাতার বিশ্বকাপে মেসির হাতে ওঠে সেই ট্রফি, যার অপেক্ষায় ছিল আর্জেন্টিনা এবং তাঁর কোটি কোটি সমর্থক।
২০২৪ সালে আরেকটি কোপা আমেরিকা জিতে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সাফল্যের তালিকাকে আরও সমৃদ্ধ করেন মেসি।
সমালোচনা থেকে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে আপন মানুষ
মেসির জাতীয় দলের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত তাঁর সঙ্গে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের সম্পর্কের পরিবর্তন।
একসময় তাঁকে নিয়ে অভিযোগ ছিল, বার্সেলোনার হয়ে যে মেসিকে দেখা যায়, আর্জেন্টিনার হয়ে সেই মেসিকে দেখা যায় না। কেউ কেউ তাঁর দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। বিশ্বকাপ কিংবা কোপা আমেরিকা জিততে না পারা ছিল সমালোচকদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্ক বদলেছে। মেসি কখনো জাতীয় দলের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাননি। ব্যর্থতার পরও ফিরেছেন, আবার চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ জয় তাঁকে শুধু সফল অধিনায়কই বানায়নি, বদলে দিয়েছে পুরো দেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক।
যে মেসিকে একসময় প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল, বিদায়ের দিনে সেই মেসিকেই আর্জেন্টিনা বিদায় জানাল নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রিয় ফুটবলারদের একজন হিসেবে।
মেসির পর আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি কার?
মেসির বিদায়ের পর এখন বড় প্রশ্ন—আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি কার গায়ে উঠবে? নতুন প্রজন্মে প্রতিভাবান ফুটবলারের অভাব নেই। কিন্তু যে-ই এই জার্সি পরবেন, তাঁর সঙ্গে মেসির তুলনা আসাটা প্রায় অনিবার্য।
কারণ মেসির সময়ে ১০ নম্বর শুধু একটি জার্সি নম্বর ছিল না। এটি ছিল আর্জেন্টিনার আক্রমণ, নেতৃত্ব, আশা এবং সবচেয়ে বড় মুহূর্তগুলোর প্রতীক।
একদিন অন্য কোনো ফুটবলার অবশ্যই এই নম্বর পরবেন। কিন্তু মেসির ১০ নম্বর জার্সির সঙ্গে যে স্মৃতি তৈরি হয়েছে, সেটি পুনরাবৃত্তি করা সহজ হবে না।
সংখ্যার চেয়েও বড় মেসির আর্জেন্টিনা-গল্প
লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে ম্যাচ, গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা ট্রফির সংখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু তাঁর আর্জেন্টিনা-গল্পের পুরোটা কোনো পরিসংখ্যানেই ধরা সম্ভব নয়।
এই গল্পে ব্যর্থতা আছে, সমালোচনা আছে, জাতীয় দল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আছে। আবার ফিরে আসা, নেতৃত্ব দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ের গল্পও আছে।
একসময় যাঁকে বলা হয়েছিল তিনি নাকি বার্সেলোনার মেসি, আর্জেন্টিনার নন, শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটিই আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতীকগুলোর একজন হয়ে বিদায় নিলেন।
মনুমেন্টালে তাই শুধু একজন ফুটবলারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ হয়নি। শেষ হয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটি দীর্ঘ অধ্যায়।
১০ নম্বর জার্সি থাকবে, নতুন কেউ সেটি পরবেনও। কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসির ১০ নম্বর যুগ আর ফিরবে না।
