ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিমানযাত্রীদের অধিকার আরও শক্তিশালী ও স্পষ্ট করতে দীর্ঘ ১২ বছরের আলোচনার পর একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছেছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিল। নতুন এই চুক্তির মাধ্যমে ২০০৪ সালে প্রণীত যাত্রী অধিকারবিষয়ক আইন প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে হালনাগাদ করা হচ্ছে।
নতুন নিয়মে ফ্লাইট বিলম্বের ক্ষেত্রে যাত্রীদের ক্ষতিপূরণের বিদ্যমান অধিকার বহাল রাখা হয়েছে। আলোচনার সময় কিছু সদস্যরাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য বিলম্বের সময়সীমা তিন ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে চার ঘণ্টা করার প্রস্তাব দিলেও তা শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়নি।
ফলে আগের মতোই ১,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ফ্লাইটে তিন ঘণ্টার বেশি বিলম্ব হলে ২৫০ ইউরো, ১,৫০০ থেকে ৩,৫০০ কিলোমিটার বা অভ্যন্তরীণ ইইউ রুটে ৪০০ ইউরো এবং দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইটে ৬০০ ইউরো পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
এছাড়া নির্ধারিত যাত্রার ১৪ দিনের কম সময় আগে ফ্লাইট বাতিল করা হলেও যাত্রীরা ক্ষতিপূরণের অধিকার বজায় রাখবেন।
বিনামূল্যে বহন করা যাবে ব্যক্তিগত ব্যাগ
নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতিটি যাত্রীকে অতিরিক্ত কোনো চার্জ ছাড়াই একটি ছোট ব্যক্তিগত ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক বা হ্যান্ডব্যাগ বহনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। শর্ত হলো, ব্যাগটি অবশ্যই সামনের আসনের নিচে রাখা যায় এমন আকারের হতে হবে।
একই সঙ্গে বিতর্কিত “নো-শো” নীতিও বাতিল করা হচ্ছে। অর্থাৎ, একই বুকিংয়ের প্রথম অংশের ফ্লাইটে যাত্রী না উঠলে পরবর্তী বা ফেরার ফ্লাইট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করতে পারবে না কোনো এয়ারলাইন।
ক্ষতিপূরণ দাবি হবে আরও সহজ
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের যোগ্য হলে বিমান সংস্থাগুলোকে ফ্লাইট পৌঁছানোর সর্বোচ্চ ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রীকে ইলেকট্রনিকভাবে তার অধিকার সম্পর্কে জানাতে হবে।
এছাড়া ক্ষতিপূরণের আবেদন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে এবং সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ প্রদান অথবা আবেদন প্রত্যাখ্যানের সুস্পষ্ট কারণ জানাতে হবে।
বিলম্বে বাড়ছে যাত্রীসেবা
ফ্লাইট বিলম্বের সময় যাত্রীদের সহায়তাও আরও জোরদার করা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী—
- প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
- তিন ঘণ্টার বেশি বিলম্ব হলে অতিরিক্ত সহায়তা দিতে হবে।
- রাতযাপনের প্রয়োজন হলে হোটেল এবং যাতায়াতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ফ্লাইট বাতিল বা বোর্ডিংয়ে বাধা দেওয়া হলে তিন ঘণ্টার মধ্যে বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে হবে। এয়ারলাইন তা করতে ব্যর্থ হলে যাত্রীরা নিজেরাই বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা করে মূল টিকিটের মূল্যের সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ফেরত দাবি করতে পারবেন।
বিশেষ যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা
নতুন চুক্তিতে গর্ভবতী নারী, শিশু, একা ভ্রমণকারী অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত সুরক্ষা যুক্ত করা হয়েছে।
পরিবারের সদস্য ও সহায়তাকারী ব্যক্তিদের অতিরিক্ত অর্থ ছাড়াই একসঙ্গে বসার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি হুইলচেয়ারসহ চলাচলের সহায়ক সরঞ্জাম এবং সহায়ক কুকুর (Assistance Dog) বিনামূল্যে বহনের সুযোগ থাকবে।
যেসব ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ প্রযোজ্য নয়
তবে আগের মতোই কিছু ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এয়ারলাইনস ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে না। এর মধ্যে রয়েছে—
- বৈরী আবহাওয়া
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ
- সশস্ত্র সংঘাত
- নিরাপত্তাজনিত ঘটনা
- ধর্মঘটসহ নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতি
তবে এমন ক্ষেত্রে বিমান সংস্থাকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে কেন ক্ষতিপূরণ প্রযোজ্য নয় এবং কী ধরনের যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন।
