পর্তুগালে বিদেশির সংখ্যা রেকর্ড, বাংলাদেশিসহ অভিবাসী এখন মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ

Portugal immigration news

পর্তুগালে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা (INE)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পর্তুগালের মোট জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৩১ জন, যার মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ বিদেশি নাগরিক বসবাস করছেন। অর্থাৎ, দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশই এখন বিদেশি।

মাত্র চার বছরের ব্যবধানে পর্তুগালে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা ৭ লাখ ৪৮ হাজার ১৫৫ জন থেকে বেড়ে প্রায় ১৬ লাখে পৌঁছেছে। এই সময়ে বিদেশি জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

পর্তুগাল সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে শিথিল নীতির কারণেই বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। সে সময় পর্যটক ভিসায় এসে চাকরি খোঁজার আগ্রহ প্রকাশের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুযোগ পাওয়া যেত। তবে ২০২৪ সালে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অভিবাসন নীতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

দেশটির প্রেসিডেন্সি বিষয়ক মন্ত্রী আন্তোনিও লেইতাও আমারো বলেন, নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর না হলে বর্তমানে বিদেশির সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতো। সরকার এখন শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী অভিবাসন ব্যবস্থাপনা পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

ব্রাজিলিয়ানদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পর্তুগালে সবচেয়ে বড় বিদেশি সম্প্রদায় ব্রাজিলের। বর্তমানে দেশটিতে ৫ লাখ ৭৪ হাজার ১৯৫ জন ব্রাজিলিয়ান বসবাস করছেন, যা মোট বিদেশি জনসংখ্যার ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

এরপরের অবস্থানে রয়েছে—

  • অ্যাঙ্গোলা: ১ লাখ ৩ হাজার ১৪০ জন
  • ভারত: ৯৩ হাজার ৬৮৩ জন
  • কেপ ভার্দে: ৭৬ হাজার ৯৯ জন
  • নেপাল: ৫৬ হাজার ৮৬৬ জন
  • বাংলাদেশ: ৫৬ হাজার ৭২৪ জন
  • গিনি-বিসাউ: ৫৩ হাজার ৫৫৫ জন

পর্তুগালে বর্তমানে বিশ্বের ১১৫টিরও বেশি দেশের নাগরিক বসবাস করছেন বলে জানিয়েছে INE।

কোন অঞ্চলে বিদেশির সংখ্যা বেশি

বিদেশি নাগরিকদের সবচেয়ে বেশি বসবাস গ্রেটার লিসবন অঞ্চলে, যেখানে মোট বিদেশিদের ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ বসবাস করেন।

অন্যদিকে, আলগার্ভ অঞ্চলে বিদেশিদের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। সেখানে মোট জনসংখ্যার ২৭ দশমিক ৯ শতাংশই বিদেশি নাগরিক। কিছু পৌরসভায় বিদেশিদের সংখ্যা স্থানীয় জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।

অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব, বাড়ছে চাপও

পর্তুগালের জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে অভিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কর্মক্ষম বয়সী এসব মানুষ কৃষি, নির্মাণ, পর্যটন ও সেবা খাতে শ্রমঘাটতি পূরণ করছেন। তাদের কর ও সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে অবদান দেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করছে।

তবে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সরকারি সেবা খাতেও চাপ বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪০ হাজার থেকে ৭০ হাজারে পৌঁছেছে। একই সময়ে বিদেশিদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সংখ্যা ৩ লাখ ২৬ হাজার থেকে বেড়ে ১৪ লাখে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় নিবন্ধিত বিদেশি রোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ২৮ হাজার থেকে বেড়ে ৮ লাখ ৭১ হাজারে পৌঁছেছে।

আবাসন সংকটও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

অভিবাসন ছাড়া জনসংখ্যা কমে যেত

পরিসংখ্যান বলছে, পর্তুগালে প্রতি ১০০ জন তরুণের বিপরীতে বর্তমানে ১৮৮ দশমিক ৮ জন প্রবীণ রয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন না থাকলে দেশটির জনসংখ্যা আরও দ্রুত কমে যেত এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বড় সংকটে পড়ত।

আবাসিক অনুমোদনে অগ্রগতি

এদিকে অভিবাসন সংস্থা AIMA জানিয়েছে, পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ৯ লাখ ৩৩ হাজার ঝুলে থাকা আবেদনের মধ্যে অধিকাংশই নিষ্পত্তির পথে। এখন পর্যন্ত ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯৮৯টি আবাসিক কার্ড ইস্যু করা হয়েছে।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী—

  • মোট নোটিশ: ৯ লাখ ৩৩ হাজার
  • অ্যাপয়েন্টমেন্ট: ৭ লাখ ৬৩ হাজার
  • সেবা গ্রহণকারী: ৫ লাখ ৬৮ হাজার
  • সিদ্ধান্ত: ৫ লাখ ২৮ হাজার
  • অনুমোদন: ৪ লাখ ৭৩ হাজার
  • প্রত্যাখ্যান: প্রায় ৫২ হাজার

সরকারের মতে, অভিবাসন পর্তুগালের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভবিষ্যতে এটি সুষম ও নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।