বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ এবং কালো টাকার উৎস বন্ধ করতে দেশে প্রচলিত ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। একই সঙ্গে দেশে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যাংক রয়েছে উল্লেখ করে ব্যাংকের সংখ্যা কমানোরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (২৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৭তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সংসদ সদস্য মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, বর্তমানে অনেক মানুষ ব্যাংকে টাকা জমা না রেখে নিজ নিজ বাসায় নগদ অর্থ সংরক্ষণ করছেন। এছাড়া যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, তাদের কাছেও বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ অবস্থায় আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট ব্যাংকে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ আবারও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, যেসব ব্যক্তি তাদের অর্থের বৈধ উৎস দেখাতে পারবেন না, তাদের জন্য নির্দিষ্ট হারে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কর দিয়ে সেই অর্থ বৈধ করার সুযোগ রাখা যেতে পারে। এতে ব্যাংকে অর্থপ্রবাহ বাড়বে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনীতিতে তারল্যও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর আহ্বান
দেশে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যাংক রয়েছে উল্লেখ করে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘এমপি হলেই একটা ব্যাংক লাগবে, নেতা হলেই একটা লিজিং কোম্পানি লাগবে—এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। দেশে এত ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। জনগণের টাকা দিয়ে এখন দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
অর্থপাচার রোধে আস্থা তৈরির আহ্বান
অর্থপাচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলা হলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কোনো অর্থ ফেরত আসেনি।
তার ভাষায়, অর্থ যেখানে নিরাপদ মনে হয়, সেখানেই চলে যায়। তাই শুধু বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা নয়, বরং দেশে এমন আর্থিক ও আইনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারে।
বাজেটে কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ
বাজেট প্রসঙ্গে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, বর্তমান কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকার যে বাজেট প্রণয়ন করেছে, সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং যুবকদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে তিনি মনে করেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত।
ভারতের নোট বাতিলের উদাহরণ টানলেন
সংসদে বক্তব্যে মাহবুব উদ্দিন খোকনের প্রস্তাবের সঙ্গে ভারতের ২০১৬ সালের নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের মিল রয়েছে। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আকস্মিকভাবে দেশটির প্রচলিত ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোটের বৈধতা বাতিল করেন।
ভারত সরকার তখন কালো টাকা, জাল নোট ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধের লক্ষ্য সামনে রেখে এই সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও পরবর্তীতে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া প্রায় ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ নোট ব্যাংকে ফিরে আসে। ফলে কালো টাকা উদ্ধারে সেই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এখনো বিতর্ক রয়েছে।
উল্লেখ্য, ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের বিষয়টি বর্তমানে কেবল একজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাব। এ বিষয়ে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
