ইউরোপের তিন দেশে সমন্বিত পুলিশি অভিযানে সন্দেহভাজন একটি অভিবাসী পাচারচক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইউরোপোল ২১ জুলাই এ তথ্য জানিয়েছে।
ইউরোপোলের বিবৃতি অনুযায়ী, ১৬ জুলাই গ্রিস থেকে পাঁচজন, বুলগেরিয়া থেকে একজন এবং নেদারল্যান্ডস থেকে একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভাড়া করা, চুরি করা এবং প্রতারণার মাধ্যমে নিবন্ধিত বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে বলকান অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অভিবাসীদের পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
অন্তত ১২টি পাচারের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহ
ইউরোপোল জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সংঘটিত অন্তত ১২টি অভিবাসী পাচারের ঘটনার সঙ্গে চক্রটির সংযোগ পাওয়া গেছে। একই নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে—এমন আরও চারটি ঘটনা বর্তমানে তদন্তাধীন।
সন্দেহভাজন চক্রটির সদস্যদের অধিকাংশ সিরিয়া ও মিসরের নাগরিক বলে জানানো হয়েছে। তারা প্রধানত মিসরীয়, ইরাকি ও সিরীয় নাগরিকদের অনিয়মিতভাবে ইউরোপের বিভিন্ন সীমান্ত পার হতে সহায়তা করত।
অভিবাসীদের প্রথমে গ্রিস থেকে বুলগেরিয়া ও রোমানিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। পরবর্তী ধাপে তাদের ইতালির দিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হতো।
ছোট গাড়ি থেকে লরিতে স্থানান্তর
ইউরোপোলের তদন্তে উঠে এসেছে, পাচারকারীরা যাত্রার প্রথম অংশে অভিবাসীদের পরিবহনের জন্য ছোট যানবাহন ব্যবহার করত। গ্রিস, বুলগেরিয়া ও রোমানিয়ার মধ্য দিয়ে সীমান্ত পার করার পর তাদের লরি বা অন্যান্য বড় পরিবহনে স্থানান্তর করা হতো। এসব যানবাহন ব্যবহার করে অভিবাসীদের ইতালির দিকে নিয়ে যাওয়া হতো।
পরিবহনে ব্যবহৃত গাড়িগুলো বৈধ ও অবৈধ—দুই ধরনের পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা হতো। চুরি করা অধিকাংশ গাড়ি গ্রিস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে ধারণা করছে ইউরোপোল।
কিছু গাড়ি তৃতীয় পক্ষ বা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেনা ও নিবন্ধন করা হতো। আবার প্রকৃত ও জাল পরিচয়পত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে গাড়ি ভাড়া নেওয়ার পর সেগুলো ফেরত দেওয়া হতো না।
বলকান অঞ্চলে পৃথক সেলের মাধ্যমে পরিচালিত কার্যক্রম
কর্তৃপক্ষের দাবি, গ্রিস, বুলগেরিয়া ও রোমানিয়ায় চক্রটির আলাদা পরিচালনাকারী সেল ছিল। পাচারের পথ নির্ধারণ ও পরিবহন কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য সদস্যরা নিয়মিত বলকান অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করত।
ইউরোপোলের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে ইউরোপে সক্রিয় অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোকে বিকেন্দ্রীভূত হলেও সুসংগঠিত, দ্রুত সম্প্রসারণযোগ্য এবং ক্রমশ আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠা নেটওয়ার্ক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও সদস্যদের গ্রেপ্তারের পরও যাতে পুরো নেটওয়ার্কের কার্যক্রম বন্ধ না হয়, সে জন্য পাচারের পথের একেকটি অংশ একেক দল পরিচালনা করে। গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকেরা অনেক ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে অবস্থান করে কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে বলে ইউরোপোলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিবাসীদের প্রলুব্ধ করার অভিযোগ
অভিবাসী পাচারকারী নেটওয়ার্কগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে সম্ভাব্য গ্রাহক বা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। কর্মসংস্থান, ভ্রমণ সহায়তা এবং সীমান্ত পার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের প্রলুব্ধ করা হয়।
প্রাথমিক যোগাযোগের পর ডিজিটাল মাধ্যমে তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা এবং নিয়ন্ত্রণ আরোপের অভিযোগও রয়েছে। ইউরোপোলের মতে, অপরাধী চক্রগুলো এখন ডিজিটাল বিপণন কৌশল শেখার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতাদের পদ্ধতি অনুসরণ করছে।
অনলাইনে কীভাবে মানুষকে আকৃষ্ট ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে বিষয়ে এক অপরাধী অন্য অপরাধীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বৈধ ব্যবসার মাধ্যমে অর্থ পাচার
অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের উৎস গোপন করতে চক্রগুলো বহু স্তরের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। এর মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি, নগদ অর্থ বহনকারী ব্যক্তি এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা রয়েছে।
একই সঙ্গে ভ্রমণ সংস্থা, আবাসন বা সম্পত্তি ব্যবসাসহ বিভিন্ন বৈধ প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে পাচার থেকে অর্জিত অর্থকে বৈধ আয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
অপরাধী নেটওয়ার্কের বিকেন্দ্রীভূত কাঠামো এবং ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর জন্য তদন্ত ও অর্থের গতিপথ শনাক্ত করাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে পাচারকারীর ওপর নির্ভরতা বাড়ছে
মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টারের গবেষণায় বলা হয়েছে, পশ্চিম বলকান অঞ্চলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার ফলে অভিবাসনের পথ পরিবর্তিত হচ্ছে। একই সঙ্গে শরণার্থী ও অভিবাসীদের পাচারকারীদের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাচ্ছে।
গবেষণাটি ১৭ জন শরণার্থী ও অভিবাসী, ২৪ জন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যদাতা এবং বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্যের পর্যালোচনার ভিত্তিতে করা হয়েছে।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মতে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পাওয়ায় অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশ করতে চাওয়া ব্যক্তিদের আরও বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে। তারা পাচারকারীদের হাতে প্রতারণা, শোষণ ও চাঁদাবাজির ঝুঁকিতেও পড়ছেন।
একটি পথ বন্ধ বা কঠোর করা হলে পাচারকারীরা দ্রুত নতুন পথ বেছে নিচ্ছে। ফলে কঠোর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পাচার পুরোপুরি বন্ধ না করে অনেক ক্ষেত্রে কার্যক্রমকে আরও গোপন ও বিপজ্জনক পথে সরিয়ে দিচ্ছে।
পশ্চিম বলকান পথে চলাচলকারী শরণার্থী ও অভিবাসীদের মধ্যে সিরিয়া ও আফগানিস্তানের নাগরিকেরা এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রয়েছেন। ভিসামুক্তভাবে পশ্চিম বলকানের কিছু দেশে প্রবেশের সুযোগের কারণে তুরস্কের নাগরিকদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তুরস্ক, ইরান ও লেবাননের মতো আশ্রয়দাতা ও ট্রানজিট দেশগুলোর দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপও অনিয়মিত অভিবাসন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
ইউরোপোলের বাজেট তিন বিলিয়ন ইউরো করার প্রস্তাব
আন্তর্জাতিক ও ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলায় ইউরোপীয় কমিশন ২০২৬ সালের জুনে নতুন কিছু ব্যবস্থা প্রস্তাব করে। এর মধ্যে আন্তঃসীমান্ত পুলিশি তদন্তে ইউরোপোল এবং বিচারক ও প্রসিকিউটরদের সহযোগিতা সমন্বয়কারী সংস্থা ইউরোজাস্টের ক্ষমতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৮ থেকে ২০৩৪ সালের বহুবার্ষিক আর্থিক কাঠামোর অধীনে ইউরোপোলের বাজেট দ্বিগুণ করে তিন বিলিয়ন ইউরো করার প্রস্তাব দিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন। অতিরিক্ত অর্থ জনবল বৃদ্ধি এবং উন্নত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরিতে ব্যয় করার কথা রয়েছে।
ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত অভিবাসী পাচার মোকাবিলায় ইউরোপোল ইউরোপিয়ান সেন্টার অ্যাগেইনস্ট মাইগ্র্যান্ট স্মাগলিং বা ইসিএএমএস চালু করেছে। কেন্দ্রটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে পাচারকারী নেটওয়ার্ক, তাদের নেতৃত্ব এবং সহায়ক অবকাঠামো শনাক্ত করার কাজ করবে।
অভিবাসী পাচার প্রতিরোধে সহযোগিতা শক্তিশালী করতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রেগুলেশন (ইইউ) ২০২৫/২৬১১ গৃহীত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের মার্চে ইউরোপোলের অধীনে ইসিএএমএস প্রতিষ্ঠা করা হয়।
