ইউরোপে অস্থায়ী সুরক্ষায় ৪৪ লাখের বেশি মানুষ, নতুন পরিসংখ্যান প্রকাশ

Temporary Protection EU

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে অস্থায়ী সুরক্ষার আওতায় থাকা মানুষের সংখ্যা ৪৪ লাখ ছাড়িয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে নিজ দেশ ছেড়ে আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষের বড় অংশ বর্তমানে জার্মানি, পোল্যান্ড ও চেকিয়ায় বসবাস করছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাট (Eurostat) সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ইউক্রেন থেকে পালিয়ে আসা মোট প্রায় ৪৪ লাখ ৩০ হাজার মানুষ ইইউর বিভিন্ন দেশে অস্থায়ী সুরক্ষার আওতায় ছিলেন।

জুলাইয়ের শেষের তুলনায় আগস্টে এই সংখ্যা বেড়েছে ৩ হাজার ২৯০ জন বা শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। নতুন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপের বেশির ভাগ দেশেই অস্থায়ী সুরক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।

সবচেয়ে বেশি মানুষ আশ্রয় পেয়েছেন জার্মানি, পোল্যান্ড ও চেকিয়ায়

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন থেকে আসা বাস্তুচ্যুত মানুষের সবচেয়ে বড় অংশকে অস্থায়ী সুরক্ষা দিয়েছে জার্মানি।

দেশটিতে আগস্টের শেষ পর্যন্ত ১২ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫৫ জন অস্থায়ী সুরক্ষার আওতায় ছিলেন। এটি ইইউর মোট সুরক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের ২৯ দশমিক ২ শতাংশ।

দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পোল্যান্ড। সেখানে ৯ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯৫ জন অস্থায়ী সুরক্ষা পেয়েছেন, যা মোট সংখ্যার ২১ দশমিক ২ শতাংশ।

তৃতীয় অবস্থানে থাকা চেকিয়ায় এ ধরনের সুরক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৩৬০ জন। দেশটিতে ইইউর মোট অস্থায়ী সুরক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের প্রায় ৯ শতাংশ বসবাস করছেন।

ইউরোপের ২৪টি দেশে বেড়েছে সুরক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা

জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যদেশের মধ্যে ২৪টিতে অস্থায়ী সুরক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি দেখা গেছে জার্মানিতে। এক মাসে দেশটিতে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৪ হাজার ৩৩০ জন।

রোমানিয়ায় বেড়েছে ৩ হাজার ৪৪০ জন এবং চেকিয়ায় বেড়েছে ৩ হাজার ১৩৫ জন।

তবে তিনটি দেশে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। পোল্যান্ডে অস্থায়ী সুরক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা কমেছে ১৩ হাজার ৬৬৫ জন। ফিনল্যান্ডে কমেছে ৬ হাজার ২৬০ জন এবং ফ্রান্সে কমেছে ২ হাজার ১২৫ জন।

ইউরোস্ট্যাট জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশে অস্থায়ী সুরক্ষার নিবন্ধন বাতিল বা হালনাগাদের পদ্ধতি এক নয়। এ কারণে কোনো কোনো দেশে মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

জনসংখ্যার তুলনায় সবচেয়ে বেশি আশ্রয় দিয়েছে চেকিয়া

মোট সংখ্যার হিসাবে জার্মানি এগিয়ে থাকলেও নিজ দেশের জনসংখ্যার তুলনায় সবচেয়ে বেশি অস্থায়ী সুরক্ষাপ্রাপ্ত মানুষ রয়েছেন চেকিয়ায়।

আগস্টের শেষ পর্যন্ত চেকিয়ায় প্রতি এক হাজার বাসিন্দার বিপরীতে অস্থায়ী সুরক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৩৬ দশমিক ৫ জন।

এরপর রয়েছে স্লোভাকিয়া, যেখানে প্রতি এক হাজার বাসিন্দার বিপরীতে এই সংখ্যা ২৭ দশমিক ৭ জন। সাইপ্রাসে সংখ্যাটি ২৭ জন।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক গড় প্রতি এক হাজার বাসিন্দার বিপরীতে ৯ দশমিক ৮ জন।

অস্থায়ী সুরক্ষাপ্রাপ্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু

ইউরোস্ট্যাটের নতুন প্রতিবেদনে অস্থায়ী সুরক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত অস্থায়ী সুরক্ষার আওতায় থাকা মানুষের ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী।

অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের হার ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ। শিশু ও ১৮ বছরের কম বয়সীদের হার ২৯ দশমিক ১ শতাংশ।

অস্থায়ী সুরক্ষার আওতায় থাকা মানুষের ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি ইউক্রেনের নাগরিক। বাকি অংশের মধ্যে রয়েছেন ইউক্রেন থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা অন্য দেশের যোগ্য নাগরিকরা।

ইউরোপে অস্থায়ী সুরক্ষা বলতে কী বোঝায়?

অস্থায়ী সুরক্ষা বা Temporary Protection হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি বিশেষ ব্যবস্থা। যুদ্ধ বা বড় ধরনের সংকটের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা যায়।

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশটি ছেড়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেন।

পরিস্থিতি বিবেচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৪ মার্চ ২০২২ বিশেষ অস্থায়ী সুরক্ষাব্যবস্থা চালু করে।

এই ব্যবস্থার আওতায় যোগ্য ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট দেশে বসবাসের অনুমতি এবং নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী চাকরি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তার সুযোগ পেতে পারেন।

তবে অস্থায়ী সুরক্ষা সাধারণ আশ্রয় আবেদন বা স্থায়ী রেসিডেন্স পারমিটের সমতুল্য নয়। এটি বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেওয়া হয়।

অস্থায়ী সুরক্ষার মেয়াদ ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত

ইউক্রেন থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য অস্থায়ী সুরক্ষার মেয়াদ আগেই বাড়িয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

২০২৫ সালের ১৩ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিল এই সুরক্ষাব্যবস্থার মেয়াদ ৪ মার্চ ২০২৬ থেকে বাড়িয়ে ৪ মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এর ফলে সংশ্লিষ্ট বিধানের আওতায় থাকা যোগ্য ব্যক্তিরা বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৭ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত অস্থায়ী সুরক্ষার সুবিধা পাবেন।

তবে এই সময়ের পরে কী ব্যবস্থা কার্যকর হবে, তা ভবিষ্যতের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য এই পরিসংখ্যানের গুরুত্ব কী?

ইউরোপে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইউক্রেন থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের অস্থায়ী সুরক্ষাব্যবস্থা এবং সাধারণ অভিবাসন বা আশ্রয় আবেদন এক নয়।

ইউরোপের কোনো দেশে বসবাস করছেন বলেই একজন বাংলাদেশি নাগরিক এই বিশেষ অস্থায়ী সুরক্ষার অধিকারী হবেন না।

এই ব্যবস্থা মূলত ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত নির্ধারিত শ্রেণির মানুষের জন্য প্রযোজ্য। নির্দিষ্ট শর্তে ইউক্রেনে বসবাসকারী অন্য দেশের নাগরিকরাও এর আওতায় আসতে পারেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে চাকরি, পড়াশোনা, পরিবার পুনর্মিলন বা আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ইউরোপে যাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সাধারণ অভিবাসন ও আশ্রয়সংক্রান্ত আইন প্রযোজ্য হয়।

ফলে অস্থায়ী সুরক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের পরিসংখ্যানকে ইউরোপে বসবাসকারী সব অভিবাসী বা সব আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।

ইউরোপে অস্থায়ী সুরক্ষার প্রয়োজন এখনো রয়েছে

ইউরোস্ট্যাটের নতুন তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর চার বছরের বেশি সময় পরও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৪৪ লাখের বেশি মানুষ বিশেষ অস্থায়ী সুরক্ষাব্যবস্থার অধীনে রয়েছেন।

জার্মানি, পোল্যান্ড ও চেকিয়া এখনো সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে এই সুবিধা দিচ্ছে।

আগস্টে সামগ্রিক সংখ্যা খুব বেশি না বাড়লেও ২৭টি সদস্যদেশের মধ্যে ২৪টিতে সুরক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের ইউরোপে অবস্থানের চলমান চিত্র তুলে ধরে।