চলতি বছর সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছানো অভিবাসনপ্রত্যাশী ও শরণার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে যাত্রীর সংখ্যা কমলেও ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিকের বিপজ্জনক পথে মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ২ হাজার ২৯২ জন মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।
আইওএমের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে সমুদ্রপথে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী ও শরণার্থী ইউরোপে পৌঁছেছেন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৯৮ হাজার ৪০। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সমুদ্রপথে আগমন কমেছে ৩৯ শতাংশ।
কিন্তু একই সময়ে সমুদ্রযাত্রায় মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা গত বছরের ১ হাজার ৯৯৯ থেকে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ২৯২। আইওএম বলছে, ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিকের অভিবাসন রুটগুলো এখনো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সামুদ্রিক পথগুলোর মধ্যে রয়েছে।
ইতালির পথে অভিবাসী আগমন কমেছে ৫৫ শতাংশ
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে ইতালিমুখী সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে। গত বছরের একই সময়ে এই পথে ৪৮ হাজার ২৩১ জন ইউরোপে পৌঁছেছিলেন। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৩৯৩ জনে—অর্থাৎ আগমন কমেছে প্রায় ৫৫ শতাংশ।
তবে মানুষের যাত্রা কমলেও এই পথ আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। গত বছর একই সময়ে সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় পথে ৮৪৪ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার তথ্য ছিল। এবার তা বেড়ে ৯৯৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
এই রুটে উত্তর আফ্রিকা, বিশেষ করে লিবিয়া থেকে অনেকে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করেন। আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সমুদ্রে ১৭ হাজার ৬৭ জন অভিবাসীকে আটক করে লিবিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়েছে।
গ্রিসের পথে মৃত্যু বেড়ে ৪১৭
পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুটেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা গেছে। গ্রিসে চলতি বছর ২০ হাজার ৪২৮ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী পৌঁছেছেন, যা গত বছরের একই সময়ের ২৫ হাজার ৪২৭ জনের তুলনায় কম।
কিন্তু এই রুটে মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছরের ২৮৪ জনের বিপরীতে এবার প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা ৪১৭ জনে পৌঁছেছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্ব লিবিয়া থেকে ক্রিটের দিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহারের প্রবণতা এই অঞ্চলে প্রাণহানির একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্পেনের পথেও প্রাণহানি বেশি
স্পেনমুখী আটলান্টিক ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় পথেও আগমন কমেছে। চলতি বছর এসব পথ দিয়ে ১৬ হাজার ৭৯৪ জন স্পেনে পৌঁছেছেন। গত বছরের একই সময়ে সংখ্যাটি ছিল ২২ হাজার ৮৫৫।
তবে এসব পথে অন্তত ৮৭৯ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার তথ্য দিয়েছে আইওএম। বিশেষ করে আফ্রিকা থেকে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর আটলান্টিক পথটি দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
প্রকৃত প্রাণহানি আরও বেশি হতে পারে
আইওএম সতর্ক করেছে, প্রকাশিত পরিসংখ্যানের চেয়েও প্রকৃত মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা বেশি হতে পারে। অনেক নৌকাডুবি ও নিখোঁজের ঘটনা নথিভুক্ত না হওয়ায় সেগুলো আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বলেন, এই পরিসংখ্যান একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে—ইউরোপে সমুদ্রপথে মানুষের আগমন কমেছে, কিন্তু নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে উদ্বেগজনক সংখ্যক মানুষ এখনো মারা যাচ্ছেন বা নিখোঁজ হচ্ছেন। সংস্থাটি নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো, মানবপাচার মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।
