ইউরোপজুড়ে চলমান রেকর্ড তাপপ্রবাহ আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইতালি ও বালকান অঞ্চলে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে দাবানলের ঝুঁকি বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবায় চাপ এবং স্বাভাবিক জনজীবনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
ইতালির কর্তৃপক্ষ সোমবার দেশটির ২২টি শহরে সর্বোচ্চ মাত্রার ‘রেড হিট অ্যালার্ট’ জারি করেছে। উত্তরাঞ্চলের বলজানো থেকে শুরু করে দক্ষিণের সিসিলি দ্বীপের পালার্মো পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা এই সতর্কতার আওতায় রয়েছে।
রোমে সেন্ট পিটার ও সেন্ট পলের ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে ভ্যাটিকানে সমবেত হাজারো তীর্থযাত্রী তীব্র গরম থেকে বাঁচতে ছাতা ও হাতপাখা ব্যবহার করেন। একই সময়ে পোপ লিও তার ঐতিহ্যবাহী অ্যাঞ্জেলাস বার্তা প্রদান করেন।
এদিকে ক্রোয়েশিয়ার আবহাওয়া বিভাগ রাজধানী জাগরেব, স্প্লিট ও দুব্রোভনিকসহ কয়েকটি অঞ্চলে লাল সতর্কতা জারি করেছে। দেশটির অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের ভিস দ্বীপে দাবানল নিয়ন্ত্রণে কয়েক ডজন দমকলকর্মী ও চারটি অগ্নিনির্বাপক বিমান কাজ করছে।
ক্রোয়েশিয়া ছাড়াও সার্বিয়া, রোমানিয়া ও হাঙ্গেরির বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেশী আলবেনিয়াতেও দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে দমকল বাহিনী অভিযান চালিয়েছে।
ইতালিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি লুকা মারকালি বলেছেন, অতিরিক্ত গরমের কারণে বনাঞ্চলে আগুন লাগার ঝুঁকি বেড়েছে। যদিও কিছু এলাকায় বজ্রসহ বৃষ্টিপাত পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তি দিলেও তা সব অঞ্চলে সমানভাবে কার্যকর নয়।
ইতালির বিমান বাহিনীর আবহাওয়াবিদ দানিয়েলে মোচিও জানিয়েছেন, বর্তমানে স্বাভাবিকের তুলনায় ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, চলমান তাপপ্রবাহ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা এখনই নেই। আগামী ৫ বা ৬ জুলাই থেকে ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ইতালি, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের কিছু অংশে নতুন করে তীব্র গরমের আরেকটি ঢেউ আঘাত হানতে পারে।
গত ২০ জুন শুরু হওয়া এই তাপপ্রবাহ ইতোমধ্যে ইউরোপজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিভিন্ন অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২১ জুনের পর থেকে ইউরোপে অতিরিক্ত তাপপ্রবাহজনিত কারণে প্রায় ১,৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যে শুধু ফ্রান্সেই প্রায় ১,০০০ অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। দেশটির জনস্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, নিহতদের বেশিরভাগই বয়স্ক নাগরিক এবং মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, প্যারিস ও আশপাশের এলাকার অনেক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত মরদেহ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন না হলে এমন তীব্র তাপপ্রবাহ প্রায় অসম্ভব ছিল। তাদের মতে, বর্তমানের অস্বাভাবিক গরম রাতের তাপমাত্রা দুই দশক আগের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ, যেখানে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে তাপমাত্রা বাড়ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিকে অনেক সময় নীরব ঘাতক বলা হয়। ইউরোপের ঘরবাড়ি, কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমন চরম তাপমাত্রা মোকাবিলার জন্য নির্মিত হয়নি।’
