ইতালিজুড়ে তরুণদের বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে উত্তপ্ত বিভিন্ন শহর

italy youth protests

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনসংকট, বেকারত্ব ও সরকারের বিভিন্ন নীতির প্রতিবাদে ইতালিজুড়ে বিক্ষোভে নেমেছেন হাজারো তরুণ ও শিক্ষার্থী। দেশটির রাজধানী রোমসহ মিলান, তুরিন, বোলোনিয়া ও ফ্লোরেন্সের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে জর্জিয়া মেলোনির সরকার।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) ইতালির বিভিন্ন শহরে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়। এর আগে ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে ব্যাপক সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। এবারের কর্মসূচি অধিকাংশ জায়গায় শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আন্দোলনকারীরা। পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো এবং সামরিক ব্যয় কমানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

বিশেষ করে ইতালির তরুণ প্রজন্ম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। বড় শহরগুলোতে বাসাভাড়া ও দৈনন্দিন খরচ বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থী এবং নতুন চাকরিজীবীদের পক্ষে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।

রোম ও তুরিনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ

শনিবারের বিক্ষোভে রাজধানী রোম, তুরিন ও বোলোনিয়ার কয়েকটি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। কোথাও বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে বোতল, পাথর ও আতশবাজি ছুড়ে মারেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু এলাকায় কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনী।

অন্যদিকে মিলানে হাজারো মানুষের বিক্ষোভ তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল। আগের সপ্তাহের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়। সম্ভাব্য হামলা ও ভাঙচুরের আশঙ্কায় কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

ইতালির কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কেন ক্ষুব্ধ ইতালির তরুণেরা?

সাম্প্রতিক বিক্ষোভের অন্যতম কারণ দেশটির ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ। জ্বালানি, খাদ্য ও বাসাভাড়ার খরচ বেড়ে গেলেও অনেক তরুণের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সমস্যা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পরিবর্তে সামরিক খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে বলেও দাবি তাঁদের।

অক্টোবরের মাঝামাঝি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মুভিমেন্তো ১৭ অত্তোব্রে’ নামে একটি আন্দোলনের প্রচার শুরু হয়। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে তরুণদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানানো হয়।

তবে ইতালির সব বিক্ষোভ একই সংগঠনের নেতৃত্বে হচ্ছে না। শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠন, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকারী ও বিভিন্ন নাগরিক গোষ্ঠী নিজেদের দাবি নিয়ে পৃথক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।

নিরাপত্তা জোরদার করেছে মেলোনি সরকার

বিক্ষোভের মধ্যে সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিলানে অতিরিক্ত ৫০০ সেনাসদস্য মোতায়েনসহ বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সরকার বলছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও সহিংসতা ও সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতি মেনে নেওয়া হবে না। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের দাবি, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিয়ে মানুষের অর্থনৈতিক অসন্তোষের সমাধান সম্ভব নয়।

৩০ অক্টোবর ফের বড় বিক্ষোভের ঘোষণা

চলমান আন্দোলনের মধ্যেই আগামী শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দেশজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন।

রোম, মিলান, তুরিন, বোলোনিয়া, ফ্লোরেন্স ও নেপলসসহ অন্তত ৫০টি শহরে কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও আবাসনসংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

ধর্মঘটের কারণে রেল যোগাযোগ, স্থানীয় গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সেবায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে ইতালির বিভিন্ন শহরে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। বিশেষ করে বিক্ষোভপ্রবণ এলাকায় চলাচল ও ব্যবসা পরিচালনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ইতালিতে চলমান বিক্ষোভ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।