বন্ধ সরকারি সেবার ওয়ান স্টপ পোর্টাল ‘মাইগভ’, বিপাকে হাজারো মানুষ

mygov bangladesh

সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলা ও প্রযুক্তিগত সংস্কারের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে সরকারের একক অনলাইন সেবা প্ল্যাটফর্ম ‘মাইগভ’ (myGov)। এতে ৪৪০টি সরকারি সেবার অনলাইন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি নথি সত্যায়ন, ভূমিসংক্রান্ত আবেদন ও বিভিন্ন সরকারি অনুমোদন নিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন সেবাপ্রার্থীরা।

রোববার (২৫ অক্টোবর) রাত থেকে ওয়েবসাইটটি বন্ধ রয়েছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) একাধিকবার প্রবেশের চেষ্টা করেও সাইটটি সচল পাওয়া যায়নি। ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে ‘Web server is down’ বার্তা এবং ক্লাউডফ্লেয়ারের ৫২১ নম্বর ত্রুটি দেখানো হয়।

সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) জানিয়েছে, নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার ও সেবার মান উন্নয়নের জন্য জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) মধ্যরাত পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলার কথা রয়েছে।

কেন বন্ধ রাখা হয়েছে মাইগভ?

সম্প্রতি ওয়েবসাইট তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে (PHP) গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত হয়েছে। এসব দুর্বলতার কারণে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনলাইন সেবা সাইবার হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এটুআইয়ের প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন জানিয়েছেন, প্ল্যাটফর্মটির কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানে সফটওয়্যার হালনাগাদ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে পিএইচপিভিত্তিক কয়েকটি নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয় চিহ্নিত হওয়ায় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে এটুআইয়ের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ফজলুল জাহিদ পাভেল জানিয়েছেন, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত ২২ অক্টোবর থেকেই কাজ শুরু হয়েছে। চূড়ান্ত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ওয়েবসাইটটি সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে।

নতুন সংস্করণ চালুর পর সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। একাধিক ডোমেইন ও সেবাব্যবস্থা যুক্ত থাকায় পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগছে।

বন্ধ রয়েছে ৪৪০টি সরকারি সেবার অনলাইন কার্যক্রম

মাইগভের মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মোট ৪৪০টি সেবা পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই সরকারি সেবার আবেদন, প্রয়োজনীয় ফি পরিশোধ এবং আবেদনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।

এসব সেবার মধ্যে রয়েছে শিক্ষাগত সনদ ও সরকারি নথি সত্যায়ন, ই-অ্যাপোস্টিল, ভূমিসংক্রান্ত আবেদন, বিভিন্ন ভাতা এবং ব্যবসায়িক লাইসেন্স ও অনুমোদনের আবেদন।

এটুআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ এই প্ল্যাটফর্ম থেকে সেবা গ্রহণ করেন। ওয়েবসাইট বন্ধ থাকায় নতুন আবেদন জমা দেওয়া এবং আগের আবেদনের অগ্রগতি দেখার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় নথি সত্যায়ন করতে চাওয়া ব্যক্তিদের জরুরি কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করেছে সিআইআরটি

বাংলাদেশ সরকারের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্ট (BGD e-GOV CIRT) গত ২২ অক্টোবর পিএইচপির নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে একটি সতর্কবার্তা প্রকাশ করে।

‘PHP2Shell’ নামে পরিচিত এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে হামলাকারীরা কোনো কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সার্ভারে অনুমতি ছাড়াই ক্ষতিকর কোড চালাতে পারে।

২৫ অক্টোবর প্রকাশিত আরেক সতর্কবার্তায় সংস্থাটি জানায়, দেশের বেশ কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এখনো পিএইচপির পুরোনো কিংবা নিরাপত্তা সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়া সংস্করণ ব্যবহার করছে।

তবে নিরাপত্তা দুর্বলতা থাকার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ইতোমধ্যে সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। মাইগভে সফল সাইবার হামলার কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ব্যাংক ও ভূমিসেবার ওয়েবসাইটেও প্রভাব

পিএইচপির নিরাপত্তা দুর্বলতা ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইটের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট প্রায় আড়াই দিন বন্ধ থাকার পর সোমবার সকাল ৮টায় পুনরায় চালু হয়। এ ছাড়া অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও সেবা বিঘ্নিত হয়।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনলাইন সেবাও নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা বন্ধ রাখা হয়েছিল।

কবে চালু হবে মাইগভ?

এটুআই জানিয়েছে, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) মধ্যরাতের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা হালনাগাদের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে সব ধরনের প্রযুক্তিগত পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পরই পুরোপুরি সেবা চালু করা সম্ভব হবে।

ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার কারণে সাময়িক অসুবিধার জন্য ব্যবহারকারীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ। সরকারি সেবা গ্রহণে ভোগান্তি এড়াতে ব্যবহারকারীদের মাইগভের পরবর্তী ঘোষণা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।